প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকঢোলের শব্দ, গানবাজনা এবং উৎসুক মানুষের ভিড়। নদীর বুকে ভাসমান হাতি, হরিণ, পঙ্খিরাজ ঘোড়া, ড্রাগন ও নাগরাজের প্রতিকৃতিতে সাজানো নান্দনিক জাহাজগুলো। নদীর দুই তীরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করছেন বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ। ধর্মীয় আবহের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ মিলে বাঁকখালী নদীর তীর হয়ে উঠেছে সম্প্রীতির মিলনমেলা।
প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে কক্সবাজারের রামুতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘কল্পজাহাজ ভাসা’ উৎসব। এবারের উৎসবে নদীতে ভাসানো হয় নান্দনিক কারুকাজে তৈরি আটটি কল্পজাহাজ। গৌতম বুদ্ধের জীবনদর্শন এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্যের বিভিন্ন দিক প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে এসব জাহাজে। কল্পজাহাজের নান্দনিক সাজসজ্জা এবং বর্ণিল আয়োজন দেখতে নদীর দুই তীরে জড়ো হয়েছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ২০০ বছর আগে মিয়ানমারে এই প্রথার সূচনা হয়েছিল। রামুতে শত বছর ধরে চলে আসছে এ আয়োজন। সময়ের সঙ্গে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে উৎসবটি স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। আয়োজকেরা এ ঐতিহ্যকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দীপন বড়ুয়া বলেন, গৌতম বুদ্ধের জন্ম থেকে বুদ্ধত্ব লাভ ও মহাপরিনির্বাণ পর্যন্ত জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কল্পজাহাজে তুলে ধরা হয়েছে। নান্দনিক নকশা এবং শৈল্পিক কারুকাজের মাধ্যমে বুদ্ধের জীবনদর্শন এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্য সবার সামনে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, গত বছর উৎসবে পাঁচটি কল্পজাহাজ ছিল। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আটটিতে। প্রতিবছরই আয়োজনটি আরও বর্ণিল এবং উৎসবমুখর হয়ে উঠছে।
উৎসবে অংশ নেওয়া মানুষের কাছে কল্পজাহাজ ভাসা কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং ভিন্ন ধর্ম এবং সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার উপলক্ষ।
কল্পজাহাজ ভাসা দেখতে আসা বাঁধন সরকার বলেন, প্রতিবছর এই উৎসবে এসে তিনি মুগ্ধ হন। তার ভাষায়, জাহাজ ভাসার মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়। এতে নানা সংস্কৃতির বৈচিত্র্য এবং সমৃদ্ধি সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি পারস্পরিক সম্প্রীতি এবং সৌহার্দ্যের দৃষ্টান্তও দেখা যায়।
আবির বড়ুয়া জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি প্রতিবছর এ উৎসবে আসেন। ধর্ম, বর্ণ এবং জাতি নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ উৎসবটিকে আনন্দঘন করে তোলে। সবার অংশগ্রহণে এটি সম্প্রীতি এবং মিলনমেলার অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
তৃষা বড়ুয়া নামে আরেকজন বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার উৎসবটি বেশি জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতি, একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া এবং সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতা তার কাছে বিশেষ ভালো লাগার।
কল্পজাহাজ ভাসা উদ্যাপন পরিষদের দাবি, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজনকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। তাদের মতে, উৎসবটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব, ধর্মীয় তাৎপর্য এবং সাংস্কৃতিক মূল্য রয়েছে। জাতীয় স্বীকৃতি পেলে এ ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং বিকাশের পথ আরও সুগম হবে।
পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক অর্পণ বড়ুয়া বলেন, এবার গৌতম বুদ্ধের প্রতিকৃতির পাশাপাশি হাতি, ময়ূর, সিংহ এবং নাগরাজসহ বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, উৎসাহ এবং উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে প্রতিবছর এ উৎসব উদ্যাপন করা হয়।
তিনি বলেন, শত শত বছর ধরে চলে আসা এ আয়োজন এখন আর শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বাংলাদেশের আবহমান সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তাই সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কল্পজাহাজ ভাসা উৎসবকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশকে ‘রেইনবো নেশন’ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছেন। রংধনুর বিভিন্ন রং যেমন মিলেমিশে সৌন্দর্য সৃষ্টি করে, তেমনি সব ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়েই বৈচিত্র্যময় এবং সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। সেখানে প্রত্যেক নাগরিক সমান মর্যাদা নিয়ে বসবাস করবেন।
তিনি আরও বলেন, সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে উদ্যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, বাংলাদেশকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ নেই। ধর্ম, বর্ণ, জাতি কিংবা নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য করা যাবে না। পাহাড় এবং সমতলের মানুষসহ সব ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের মানুষকে বাংলাদেশের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ দেখতে চায় সরকার।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কিছু মহল ধর্ম, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির নামে মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার এবং মর্যাদা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। ক্ষুদ্রতম সম্প্রদায়ের একজন মানুষও যেন রাষ্ট্রের কাছে সমান অধিকার পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অন্যায় যে-ই করুক, যে ধর্ম বা সম্প্রদায়েরই হোক, তার বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে। প্রত্যেকের ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। তবে ধর্মীয় উৎসব শুধু একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সবার মিলনমেলায় পরিণত হতে পারে।
নদীর তীরে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থানকে বাংলাদেশের প্রকৃত সৌন্দর্য হিসেবে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। তার মতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ঐক্য এবং সম্প্রীতির মধ্য দিয়েই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
কল্পজাহাজ ভাসা উৎসবের বর্ণিল আয়োজন যেন সেই সম্প্রীতিরই প্রতিচ্ছবি। নদীর বুকে ভেসে চলা আটটি জাহাজের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ মিলেছেন একই উৎসবে। ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির এই আয়োজন তাই ধর্মীয় পরিচয়ের সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে সম্প্রীতির এক অনন্য প্রকাশ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন