প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখতে যদি কোনো দেশ সহায়তা করে, তাহলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের আর্থিকভাবে শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ ঘোষণা করেছেন, যেটাকে তিনি ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ বলে অভিহিত করেছেন।
এটি ঘটেছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল সংঘাত শুরুর ছয় মাস পরে, যখন ট্রাম্প একটানা বাণিজ্যযুদ্ধের মাধ্যমে ক্ষতি করার পর এখন লক্ষ্য অর্জনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা নিচ্ছেন।
কিন্তু ইরানের গুরুত্বপূর্ণ দুই বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও রাশিয়া এর ফলে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্পের ওপর চীন ও রাশিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা সীমিত।
রাশিয়া ইতিমধ্যে ব্যাপক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে এবং মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে, চীন অবশ্য নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে প্রয়োজন হলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করতে প্রস্তুত, এর আগে তা প্রতিবারই প্রদর্শন করেছে।
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল-জাজিরাকে জানান, ট্রাম্পের এই চাপের কৌশল কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা ‘খুবই কঠিন’ হবে।
তিনি একতরফাভাবে এমন সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে চাইছেন, যা ঐতিহ্যগতভাবে বহুপক্ষীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর ছিল। এর জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যসহ চীন ও রাশিয়াকে সঙ্গে এনে কাজ করতে হবে।
গত মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে লেখেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার লড়াই হবে ‘কোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক লড়াই’ এবং তিনি সতর্ক করেন, যারা ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করবে, তাদের ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’ নিতে হবে। তিনি ব্যবসার কর্মকাণ্ড, যেমন তেল চোরাচালান, মুদ্রা বিনিময়ের ব্যবস্থা, নগদ অর্থ স্থানান্তর, এক্সচেঞ্জ হাউস, জাহাজ নিবন্ধন এবং ভুয়া বা আড়াল করা কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসা করার কথাও উল্লেখ করেন। ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এসব এখনই বন্ধ করতে হবে।’
একই দিনে, সংশ্লিষ্ট দেশে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। ইরান তাদের ভূখণ্ডে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে অভিযোগ করে আবুধাবি এ সিদ্ধান্ত নেয়।
নদার হাবিবি ধারণা করছেন, এই নিষেধাজ্ঞা আরোপে যুক্তরাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ‘জোরালোভাবে উৎসাহিত বা প্রভাবিত’ করেছে। একইভাবে, ইরানের অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদার বিশেষ করে সবচেয়ে বড় অংশীদার চীনের ওপরও যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রয়োগ করতে সক্ষম হতে পারে।
চীন-ইরান বাণিজ্য ব্যাহত করার যেকোনো মার্কিন উদ্যোগ বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েতে পারে। বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরান থেকে সমুদ্রপথে রফতানি হওয়া তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ চীন ক্রয় করেছে। তবে চীনের তেল শোধনাগারগুলোর ওপর ব্যবস্থা নিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন হতে হতে পারে। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো অধিকাংশ স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তাদের নির্ভরতা কম।
ইরানের অর্থ লেনদেনে জড়িত বড় চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে তা চাপের মুখে পড়তে পারে। তবে এমন পরিস্থিতিতে চীনও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে, যা বিষয়টিকে আরও জটিল করবে।
চ্যাথাম হাউসের চীন ও এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউ জিয়ে বলেন, ট্রাম্পের হুমকি চীনের ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ও বিদ্যমান বাণিজ্যের ওপর কোনো পরিবর্তন আনবে না। তিনি মনে করেন, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে ট্রাম্প আগ্রহী। একই সময়ে, চীনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ‘সাময়িক যুদ্ধবিরতি’ বজায় রাখতে চায়।
মাসগ্রেভ বলেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ‘আগ্রাসী’ গৌণ নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। কিন্তু চীন ও যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এক ধরনের অর্থনৈতিক ঠান্ডা যুদ্ধের মধ্যে থাকায় ট্রাম্প সম্ভবত দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাইবেন না।
গত বুধবার, ১৯ আগস্ট, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ট্রাম্পের অর্থনৈতিক অভিযানকে ওয়াশিংটনের ‘ব্যর্থ নীতির’ ধারাবাহিকতা বলে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও ‘পরাজয়’ ঘটাবে এবং তিনি যেটা বলেছেন, মার্কিন অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ বিশ্ব অর্থনীতি ও দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।
রাশিয়া, চীন, ভারত, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন শক্তিশালী দেশ নিয়ে গঠিত ব্রিকস জোটের সদস্য ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা বাজারের বাইরে নতুন অর্থায়নের পথ তৈরিতে এই জোটের গুরুত্ব কাজে লাগানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে তেহরান।
গত সপ্তাহে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি জানান, ইরান ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যা পশ্চিমা আর্থিক বাজারের বাইরে আরও অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি আরও জানান, ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন করতে পারে এবং ইরান অন্যান্য সদস্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনা করছে। তবে ইরানের সম্ভাব্য সদস্যপদ নিয়ে এনডিবি এখনও কোনো মন্তব্য করেনি। সদস্য হতে হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় যেতে হবে তেহরানকে।
তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলি আকবর দারেইনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘শ্বাসরোধকারী’ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নেবে। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ট্রাম্প এমন এক যুদ্ধে আটকে আছেন, যা তিনি জিততে পারবেন না, আবার সেখান থেকে বের হতে পারছেন না।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন