প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যমুনায় হারিয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো মাতল ঢালারচরের ফুটবল মাঠ। শেষ বাঁশিটি শুধুমাত্র একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচের সমাপ্তি ঘোষণা করেনি; বিদায় জানিয়েছে এমন একটি মাঠকে, যা আর কয়েক সপ্তাহ পরই যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
শুক্রবার (৩ জুলাই) পাবনার আমিনপুরের ঢালারচরের বালুচরে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্বপ্নগ্রাম ব্রাজিল’ ও ‘স্বপ্নগ্রাম আর্জেন্টিনা’র মধ্যে শেষ প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। ‘চর বয়েজ’ নামে পরিচিত স্থানীয় তরুণ ফুটবলাররা এতে অংশ নেন। নদীভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জনপদের মানুষকে সম্মান জানাতে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন করে বিকে ফাউন্ডেশন।
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা এখন সারা বিশ্ব জুড়ে। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার লড়াই দেখার জন্য টিভি পর্দায় চোখ রাখে কোটি কোটি মানুষ। কিন্তু ঢালারচরের মানুষগুলো ফুটবল উন্মাদনাকে বরণ করে নিয়েছে অন্য একভাবে। তাদের ছোট ছোট নৌকা আর টিনের ঘরের চালায় উড়ছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা। যখন জেলেরা নদীতে জাল ফেলছে, তখন তাদের নৌকার মাস্তুলে দোল খাচ্ছে সেই পতাকা। ঘরের স্ত্রীরা রান্নাঘরের কাজ করতে করতেও যেন এক পলক দেখে নিচ্ছে সেই পতাকার দিকে—বিশ্বকাপের স্বপ্ন তাদেরও। তবে এই স্বপ্ন তারা দেখছে এক অনিশ্চিত জীবনের মাঝে। নদী যাদের সবকিছু কেড়ে নিতে পারে, তারা অন্তত আজকের এই খেলাটি দেখবে। বিশ্বকাপের সেই উন্মাদনা হয়তো তাদের ঘরে পৌঁছায় না, কিন্তু আজ তারা সেই উন্মাদনাকে নিজেদের করে নিয়েছে।
ঢালারচরের মৎস্যজীবী ও কৃষক পরিবারগুলোর কাছে যমুনা নদী কোনও শত্রু নয়; বরং এটি একটি শক্তি, যার বিরুদ্ধে তারা লড়াই করা ছেড়ে দিয়েছে। বছর বছর ধরে এই শক্তিশালী নদী তাদের বসতবাড়ি গ্রাস করে নিচ্ছে; তাদের ফসল ও জমি কেড়ে নিচ্ছে। তারা দেখেছে প্রতিবেশীরা কিভাবে নিজেদের সবকিছু গুছিয়ে ভেতরের দিকে সরে গেছে। একমাত্র পরিচিত ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছে তারা। এখন আর কোনো রাগ নেই, এখানে শুধুমাত্র এক ক্লান্তিকর হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি।
ম্যাচ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত তরুণ জেলে ও ফুটবলার শাহিন বলেন, ‘এটাই আমাদের জীবন। নদী নেয়, আমরা সরে যাই। সবসময়ই এমন হয়েছে। এখন আর কাঁদি না, প্রশ্নও করি না। যা বাঁচানো যায় তা নিয়ে নতুন জায়গায় চলে যাই। কিন্তু প্রতিবারই ভেতর থেকে একটু একটু করে মরে যাই। আমাদের শিশুরা বড় হচ্ছে এই জেনে যে, আগামী বছর হয়তো তাদের এই খেলার মাঠটিও থাকবে না। এটা কেমন শৈশব?’
বহু বছর ধরে এই মাঠে অসংখ্য প্রীতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এখন স্থানীয়দের ধারণা, আর দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে যমুনা পুরো মাঠটি গ্রাস করবে। তাদের কাছে এটি নতুন কিছু নয়; নদীভাঙনের দীর্ঘ ইতিহাসে এটি আরেকটি পূর্বনির্ধারিত অধ্যায় মাত্র। বহু পরিবার ইতোমধ্যে একাধিকবার ঘরবাড়ি পরিবর্তন করেছে। শুধু বসতভিটাই নয়, ছেড়ে যেতে হয়েছে স্কুল, মসজিদ, এমনকি পূর্বপুরুষদের কবরও।
এই নীরব বেদনার মধ্যে এক বিকেলের জন্য ফুটবল হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকার আনন্দ। সেদিন জেলেদের জাল গুটিয়ে রাখা হয়েছিল; মাঠে পড়ে ছিল লাঙ্গল এবং চরের শিশুরা নিজেদের কল্পনায় হয়ে উঠেছিল তারকা ফুটবলার।
তাদের মধ্যে ১০ বছর বয়সী রাজু। শ্রেণিকক্ষে নয়; বাবার সঙ্গে মাছ ধরতে নদীতে সময় কাটায় সে। চরাঞ্চলের অনেক শিশুর মতো তার কাছেও নিয়মিত শিক্ষা অধরা। স্বপ্ন নয়, নদীর অনিশ্চয়তাই তারা নির্ধারণ করে তাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
রাজু বলে, ‘এরকম খেলার সুযোগ আমরা কখনও পাই না। বেশিরভাগ সময় বাবার সঙ্গে নৌকায় থাকি, জাল ফেলি। স্কুলে গিয়েছি মাত্র কয়েকবার। বাবা বলেন, আবার যদি ভিটা ছেড়ে চলে যেতেই হয়, তাহলে স্কুলে যাওয়ার কী মানে? কিন্তু গতকাল সব ভুলে গিয়েছিলাম। আমি আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছি, একটা গোলও করেছি। কিছু সময়ের জন্য আমি আর জেলের ছেলে ছিলাম না; আমি ছিলাম একজন চ্যাম্পিয়ন।’
শাহিন এমন একটি সম্প্রদায়ের পক্ষে কথা বললেন, যারা এই সুন্দর খেলায় ক্ষণিকের সান্ত্বনা খুঁজে পায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা ভেতরে ভেতরে ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছি। নদী আমাদের জমি, ঘর, আশা—সব কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু ওই নব্বই মিনিট আমরা সত্যিই বেঁচে ছিলাম। আমরা হেসেছি, উল্লাস করেছি, ভুলে গিয়েছিলাম যে নদী অপেক্ষা করছে। মাঠটা যখন আর থাকবে না, তখন আমাদের শিশুরা কোথায় খেলবে? নদী তার পরোয়া করে না। কিন্তু এই একটি স্মৃতি আমরা বয়ে নিয়ে যাব—একটি দিন, যেদিন আমরা শুধুমাত্র টিকে থাকার জন্য লড়িনি, মানুষ হিসেবেও বেঁচেছিলাম।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন