প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একজন সাংবাদিকের হাতে থাকা কলম কিংবা ক্যামেরা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার অস্ত্র নয়; এটি সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরার একটি মাধ্যম। জনস্বার্থে কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এলে তা অনুসন্ধান করে সত্যতা যাচাইয়ের পর প্রকাশ করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
তবে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে ভুল হলে তার দায়ও এড়ানোর সুযোগ নেই। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রকাশিত তথ্য মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রচলিত আইনে প্রতিকার চাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটাই আইনের শাসনের স্বাভাবিক অংশ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—মামলা করার অধিকার যেমন থাকবে, তেমনি সেই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির নিশ্চয়তা কি থাকবে না?**
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৮ সালে প্রণীত বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পরবর্তীতে ২০২৩ সালে প্রণীত সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে সাংবাদিক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহলে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব আইনের বিভিন্ন ধারার প্রয়োগকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
একজন সাংবাদিক যদি সত্যিই মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করে থাকেন, তাহলে তদন্ত হোক, প্রমাণ যাচাই হোক এবং অভিযোগ সত্য হলে দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাকে আইনের আওতায় আনা হোক। **কিন্তু অভিযোগের বিচার করতে গিয়ে যদি একজন সাংবাদিককে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয়, তাহলে সেটি শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর চাপ নয়—এটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপরও এক ধরনের ভীতির পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
কারণ একজন সাংবাদিক যখন দেখেন, একটি প্রতিবেদনের কারণে তাকে দীর্ঘদিন মামলা মোকাবিলা করতে হতে পারে, তখন পরবর্তী সময়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির তথ্য হাতে এলেও তিনি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়ে আমি কি বিষয়টি প্রকাশ করব, নাকি মামলা ও হয়রানির আশঙ্কায় নীরব থাকব?”**
এই ভয় যদি সাংবাদিকতার জায়গা দখল করে নেয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শুধু সাংবাদিক নন—ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষও। কারণ অনেক সময় একজন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে না-পারা অভিযোগই একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের প্রতিবেদনের মাধ্যমে জনসমক্ষে আসে।
তাই সাংবাদিকতার স্বাধীনতা মানে যা খুশি তা প্রকাশের স্বাধীনতা নয়। **সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করা, প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া এবং পাঠকের সামনে সত্যকে যথাসম্ভব নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা।
অন্যদিকে, সংবাদে কারও বিরুদ্ধে ভুল বা মিথ্যা তথ্য প্রকাশিত হলে তারও পূর্ণ আইনি প্রতিকার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিকার যেন সাংবাদিককে চুপ করিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার না হয়—এ বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি।
মামলা হবে—বিচারও হবে। অভিযোগ থাকবে—প্রমাণও হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি হবে, আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সাংবাদিকও আইনি সুরক্ষা পাবেন।
এটাই হওয়া উচিত একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বাভাবিক চিত্র।
বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়। এতে অভিযোগকারী যেমন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, তেমনি অভিযুক্ত সাংবাদিকও দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। সবচেয়ে বড় কথা, এর প্রভাব পড়ে **সত্য অনুসন্ধানের সাহসের ওপর।
আমরা এমন একটি সাংবাদিকতার পরিবেশ চাই, যেখানে সাংবাদিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করতে ভয় পাবেন না; আবার সাংবাদিকতার নাম করে কেউ মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পার পাওয়ার সুযোগও পাবেন না।
কারও বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ মানেই তিনি অপরাধী—এমন নয়। আবার সাংবাদিকের হাতে প্রেস কার্ড থাকলেই তার প্রকাশিত প্রতিটি তথ্য সত্য—এমন দাবিও করা যায় না। সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার।
তাই প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা, যেখানে **সাংবাদিকের স্বাধীনতা থাকবে, নাগরিকের সম্মান ও অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত হবে।
শেষ কথা একটাই— সাংবাদিকের কলম যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় না পায়, আর আইনের আদালত যেন ন্যায়বিচারের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করিয়ে না রাখে।
সত্য প্রকাশের পথ কঠিন হতে পারে, কিন্তু সেই পথ যেন ভয় ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে বন্ধ হয়ে না যায় এ দায়িত্ব সাংবাদিকের যেমন, তেমনি রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থারও।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন