প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সমুদ্রসৈকত সাধারণত খোলা আকাশ, নীল জল এবং মুক্ত পরিবেশের প্রতীক। কিন্তু ইতালির ইউরোপীয় অঞ্চলে একটি সৈকত রয়েছে, যেখানে পুরুষ এবং নারীদের জন্য আলাদা আলাদা অংশ রয়েছে। এই সৈকতের বিশেষত্ব হলো সমুদ্র এবং বালুকাবেলার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ১০ ফুট উঁচু সাদা দেয়াল।
ত্রিয়েস্তের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই সৈকতের নাম ‘লা ল্যানতার্না’, যা স্থানীয়দের কাছে ‘এল পেদোচিন’ নামে পরিচিত। শতাধিক বছর ধরে এই লিঙ্গ-পৃথক সৈকতটি তার ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ন রেখেছে।
সৈকতে প্রবেশ করার পর, একটি করিডর পেরোলেই দেখা যায় নারী ও পুরুষদের জন্য দুটি আলাদা অংশ। নারীদের অংশে বিভিন্ন বয়সের নারীকে বই পড়তে, সন্তানদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে অথবা রোদ পোহাতে দেখা যায়। শহরের কেন্দ্রের নিকট অবস্থিত হওয়ায় কর্মজীবী অনেক নারী দুপুরের বিরতিতে এখানে এসে সাঁতার কাটেন।
অন্যদিকে, দেয়ালের ওপাশে পুরুষদের অংশে আড্ডা, তাস খেলা এবং বিশ্রাম নেওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। বন্দরকর্মীদেরও কাজের ফাঁকে এখানে সময় কাটাতে দেখা যায়। তবে সাগরের পানিতে গিয়ে এই বিভাজন আর থাকে না। তীর থেকে কিছুটা দূরে সাঁতরে গেলেই নারী ও পুরুষের দেখা হওয়ার সুযোগ থাকে।
বাইরের পর্যটকদের কাছে এই ব্যবস্থা কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। এমনকি মিলান থেকে আসা এক পর্যটক দম্পতি একবার এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অর্থ ফেরত চেয়েছিলেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৃষ্টিতে এই দেয়াল কোনো বাধা নয়; বরং এটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতীক।
নারী দর্শনার্থীদের অনেকের মতে, পুরুষের দৃষ্টি বা সামাজিক বিচার-বিশ্লেষণের চাপ ছাড়াই এখানে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাতে পারেন। শরীর নিয়ে অস্বস্তি বা সাজগোজের চাপ ছাড়াই তারা নিজেদের মতো করে সৈকত উপভোগ করেন। স্থানীয় লেখক নিকোল ব্রুসাফেরোর ভাষায়, এটি বৈষম্যের জায়গা নয়, বরং নারীদের জন্য একটি স্বাধীন পরিসর।
ইতিহাস বলছে, ১৯০৩ সালের দিকে সৈকতটি চালু হয়। সে সময় ত্রিয়েস্তে ছিল অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অধীনে। তৎকালীন অস্ট্রীয় আইনে জনসম্মুখে শালীনতা বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেত। সেই সময় থেকেই সৈকতে বিভাজনের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
‘পেদোচিন’ শব্দের অর্থ ‘উকুন’। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, একসময় অস্ট্রীয় সৈন্যরা এই এলাকায় এসে ঘোড়ার গায়ের পোকামাকড় পরিষ্কার করতেন। পরে ১৯৫৮ সালে নারীদের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় তাদের অংশ সম্প্রসারণ করে দেয়ালটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, তৎকালীন ত্রিয়েস্তেতে নারীদের শিক্ষা ও স্বাধীনতার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। ফলে সময়ের সঙ্গে এই সৈকত নারীদের অধিকার ও ক্ষমতায়নের একটি প্রতীক হিসেবেও পরিচিতি পায়।
বর্তমানে ইতালির অধিকাংশ সৈকত যেখানে পর্যটকদের ভিড় ও কোলাহলে মুখর, সেখানে এল পেদোচিনে রয়েছে তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ। সৈকতের পাশে থাকা ছোট বারে বসে কফি পান অথবা স্থানীয়দের সঙ্গে গল্প করার সুযোগও রয়েছে।
সৈকতের ঐতিহ্যবাহী দেয়ালটি সরিয়ে ফেলার দাবি নিয়ে মাঝে মাঝে আলোচনা হলেও স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশ এর পক্ষে নন। তাদের কাছে শত বছরের এই ব্যবস্থা ত্রিয়েস্তের নিজস্ব ঐতিহ্যের অংশ।
আধুনিকতার যুগেও নারী-পুরুষের জন্য আলাদা পরিসর ধরে রাখা এই সৈকত তাই শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং ত্রিয়েস্তের ইতিহাস, সামাজিক সংস্কৃতি ও স্থানীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন।
সূত্র: সিএনএন, দ্য আই নিউজপেপার
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন