প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাজ্য সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতি গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র বা চীন যুক্তরাজ্যের নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি প্রতিবেদনে এ বিষয়ে সতর্কতা প্রকাশ করা হয়েছে।
হাউস অব কমন্সের ব্যবসা, উদ্ভাবন, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিষয়ক বিশেষ কমিটির তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সাল থেকে চীন সম্পর্কে একটি সুসংগত কৌশল প্রণয়নে লেবার পার্টির সরকারের ব্যর্থতা যুক্তরাজ্যের জন্য ‘দুই জগতের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’ তৈরি করেছে।
কমিটির চেয়ারম্যান ও লেবার পার্টির এমপি লিয়াম বাইর্ন মন্তব্য করেছেন, চীন নিয়ে যুক্তরাজ্যের নীতির কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে দেশটির ব্যবসাও বিপদে পড়ছে। ফলে বড় ধরনের উৎপাদন সংক্রান্ত চুক্তি থেকে যুক্তরাজ্য বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার একদিকে ব্রিটিশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে না, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ‘পরিমাপ করা হয়নি, এমন ঝুঁকির ক্রমবর্ধমান ব্যবস্থাপিত সংস্পর্শ’ নিয়ন্ত্রণেও ব্যর্থ হচ্ছে।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘২০২৪ সালে নতুন সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের কৌশলগত, দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তারা তা বাস্তবায়ন করেনি।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘চীনের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক যুক্তরাজ্যকেই নির্ধারণ করতে হবে। তা না হলে ওয়াশিংটন বা বেইজিং আমাদের হয়ে সেই সম্পর্কের ধরন নির্ধারণ করার ঝুঁকি রয়েছে।’
গত ১০ বছরে চীনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যোগাযোগের অভাব ছিল। ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে চীন সফর করেছিলেন। এরপর গত জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার প্রথম সরকারি সফরে চীন যান।
এই সফরটি দুই দেশের মধ্যে ‘কূটনৈতিক শীতলতা’ কাটানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে ২০১৮ সালের পর চীনের রপ্তানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি বর্তমানে যুক্তরাজ্যে শিল্প খাতের অবক্ষয়ের আশঙ্কা তৈরি করছে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
এমপিরা চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের সুবিধাগুলোও স্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ব্রিটিশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চীনে লাভজনক কার্যক্রম রয়েছে এবং এসব প্রতিষ্ঠান সেখানে আরও ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চায়। চীনের ‘বিশ্বসেরা’ উদ্ভাবন থেকে শিখতে তাঁরা আগ্রহী।
পরিবারের আয় যখন চাপে থাকে, তখন কম দামের আমদানি পণ্য ভোক্তাদের সুবিধা দেয়। চীন থেকে আমদানি করা বৈদ্যুতিক গাড়ি এর একটি উদাহরণ।
তবে বাইর্ন চীন নীতি নিয়ে সরকারের খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সরকার পরিস্থিতি অনুযায়ী চীন নীতি তৈরি করতে থাকলে ব্রিটিশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারবে না। মন্ত্রীরা স্পষ্টতা ও ধারাবাহিকতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা দেখছি, সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে একেবারে শেষ মুহূর্তে।’
প্রতিবেদনে গত মার্চে চীনা প্রতিষ্ঠান মিং ইয়াংকে স্কটল্যান্ডে ১৫০ কোটি পাউন্ড ব্যয়ে একটি বায়ুশক্তি প্রকল্প নির্মাণের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েক বছর ধরে আলোচনা চলার পরও নির্দিষ্ট করে না জানানো নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে প্রকল্পটি আটকে দেওয়া হয়।
স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
চীনা মালিকদের কাছ থেকে ব্রিটিশ স্টিলের নিয়ন্ত্রণ জরুরি ভিত্তিতে সরকারের হাতে নেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে মিং ইয়াংয়ের প্রকল্প আটকে দেওয়ার ঘটনাকে প্রতিবেদনটিতে ‘প্রতিক্রিয়াশীলতা, অসংগতিপূর্ণ অবস্থান ও স্বচ্ছতার অভাব’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কমিটি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে নতুন কৌশল তৈরির পাশাপাশি অন্যায্য প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় নতুন বাণিজ্যিক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতির সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর সম্ভাব্য শুল্ক আরোপও রয়েছে। এ বিষয়ে ডাউনিং স্ট্রিটের পক্ষ থেকে সম্ভাবনা নাকচ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে ‘খেলার নতুন ও স্পষ্ট নিয়ম’ তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে। চীনা বিনিয়োগ নিষিদ্ধ থাকবে, এমন শিল্প খাতকে ‘লাল অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব খাতে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য উৎসাহিত করা হবে, সেগুলোকে ‘সবুজ অঞ্চল’ হিসেবে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
বাইর্ন বলেছেন, চীন নিয়ে কৌশল তৈরি করা এখন জরুরি। কারণ, ইউরোপ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বেইজিংয়ের সঙ্গে আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি ওয়াশিংটনের বিষয়ে সতর্ক হয়ে ইউরোপ নতুন বাণিজ্য সুরক্ষাব্যবস্থার প্রস্তাব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘নতুন আইনগুলো যুক্তরাজ্যকে ইইউর বাণিজ্যিক সুরক্ষাব্যবস্থার বাইরে আটকে দিতে পারে। এতে আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’
বাইর্নের মতে, ইইউর ‘মেড ইন ইউরোপ’ প্রকল্পে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারকে ইইউর সঙ্গে নীতিগত সামঞ্জস্যের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এর অংশ হিসেবে বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্ক আরোপের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা উচিত। এতে চীনের আধিপত্য ঠেকাতেও সহায়তা হবে।
ইইউর সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির শুল্ক নীতিতে যুক্তরাজ্যের সামঞ্জস্য রাখার চাপ ইতিমধ্যে রয়েছে। তবে দেশটির ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডস বলেছেন, যুক্তরাজ্যের স্বার্থ বিবেচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ইইউ ইতিমধ্যে চীনে তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্ক আরোপ করেছে। চীন থেকে আমদানি করা হাইব্রিড গাড়ির সংখ্যাও সীমিত করেছে। এখন ফ্রান্স ও জার্মানির একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে ইইউ। প্রস্তাব অনুযায়ী, চীন বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে আমদানি বন্ধ করার জন্য একটি ‘কিল সুইচ’ চালু করা হতে পারে।
গত বছর বিরল খনিজ ও চিপ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে চীন বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাজ্যের অংশীদাররা আরও দ্রুত ও আরও দূর এগিয়ে যাচ্ছে।’
চীনের সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশের বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত এখন গত বছরের রেকর্ড ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে।
২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত কার্যকর চীনের সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দেশটির ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারের আভাস পাওয়া যায়। এতে উচ্চমূল্যের পরিবেশবান্ধব পণ্য রপ্তানি কৌশলগতভাবে সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, বায়ুশক্তির টারবাইন, হাইড্রোজেন ও সৌর প্যানেল।
এএম
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন