প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরিশালের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে অভিভাবক এবং ওয়াকিফহাল মহলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নিকট অতীতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বরিশালের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ২৬ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন জিপিএ-৫ নিয়ে মাধ্যমিকের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, এবং উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলেও দেখা গেছে এযাবৎকালের সর্বনিম্ন পাসের হার। এই পরিস্থিতি অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগের পাশাপাশি সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে স্নায়ুচাপ সৃষ্টি করছে। বরিশালের শিক্ষার হার ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে, যা পূর্বে ছিল দেশের সর্বোচ্চ।
শিক্ষাবিদদের মতে, মোবাইল কালচার এবং রাতের আড্ডাবাজি বরিশালের শিক্ষার্থীদের বর্তমান অবস্থার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল সমাজের সামনে শিক্ষা ব্যবস্থার বিপরীতমুখী চলার চিত্র তুলে ধরছে। এই পরিস্থিতি অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে, তবে শিক্ষার্থীদের বিবেকও ক্রমে বিবেকহীন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
নতুন সরকারের আমলে প্রথম এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল গত বছরের তুলনায় ৪ ভাগ বেড়ে ৬০.৪৫%-এ উন্নীত হলেও উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ নিয়ে পাসের হার ৩.৪৫% ছিল, যেখানে উচ্চ মাধ্যমিকে সেই হার ছিল মাত্র ১.৬৪%। এবারের উচ্চ মাধ্যমিকে অংশগ্রহণকারী ৫৭,৯১২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯৫০ জন জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে, যেখানে মেয়েদের সাফল্য প্রায় দ্বিগুণ।
গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার ছিল ৫৬.৩৮%, তবে এবছর তা ৩.৯৮% বেড়ে ২,৭৭৮ জন জিপিএ-৫ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে, যা শিক্ষা বোর্ডের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। গত বছরও জিপিএ-৫ নিয়ে উত্তীর্ণের সংখ্যা ছিল ৩,১১৪ এবং ২০২৪ সালে তা ৬,১৪৫।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল অনেক শিক্ষকের জন্য লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোচিং বাণিজ্য নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা কিছু ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবককে সাময়িক স্বস্তি দিলেও এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ১,৫১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫টির কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি। উচ্চ মাধ্যমিকে পাস না করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা ১১।
আড্ডাবাজি এবং মোবাইল সংস্কৃতির কারণে বরিশালে ছেলেদের সাফল্যের হার মেয়েদের চেয়ে কম ছিল। এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন ৮০,৪৫৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে মেয়েদের পাসের হার ৬৬.৬৫%, যেখানে ছেলেদের পাসের হার ৫৩.১৫%। গত বছর ছেলেদের পাসের হার ছিল ৪৮.৪৫% এবং মেয়েদের ছিল ৬৩.৩৮%।
উচ্চ মাধ্যমিকে ছেলেদের গড় পাসের হার ৩৫.৩৮% হলেও মেয়েদের হার ছিল ৫২.৯৭%। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের এবারের মাধ্যমিকের ফলাফলে পাসের হার গত বছরের তুলনায় ৩.৯৭% বেড়েছে, তবে উচ্চ মাধ্যমিকে পাসের হার ৩৭.০১% কমেছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা নেমে এসেছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবারে কান্নার আওয়াজই শোনা গেছে।
এবারের মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছেলেদের সংখ্যা ১,১৯৩, মেয়েদের সংখ্যা ১,৫৮৫। উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পাওয়া ছেলেদের সংখ্যা ৩৪৩, মেয়েদের সংখ্যা ৬০৭। মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পাওয়া ২,৭৭৮ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২,৫৮৬ জন বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হয়েছে, মানবিক বিভাগে ৪৮ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২৬৮ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ব্যবসায় শাখায় ১৭ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২৪ জন জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে।
উচ্চ মাধ্যমিকের মানবিক বিভাগে ১.১৪% এবং ব্যবসায় বাণিজ্য বিভাগে ০.৯৮% ছাত্র-ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় শতভাগ উত্তীর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৫টি, যা গত বছরের ১৭টি থেকে কমেছে। পটুয়াখালী জেলার কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম এবারের শতভাগ পাসের তালিকায় নেই। উচ্চ মাধ্যমিকে বরগুনা, ভোলা ও ঝালকাঠির কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামও নেই।
মাধ্যমিকে পাসের হারের দিক থেকে পিরোজপুরের ৭০.৭২% ছাত্র-ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়ে বোর্ডের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে, বরগুনা ৬২.৯১% পাস করে দ্বিতীয় অবস্থানে এসেছে। বরিশাল ৬১.৭২% নিয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে। ঝালকাঠি ৫৮.০৩% পাস করে ৪র্থ স্থানে উঠে এসেছে, তবে পটুয়াখালী ৫৭.১০% নিয়ে ৫ম। ভোলার অবস্থান ৫৩.৭১% পাসের হার নিয়ে ৬ষ্ঠ।
উচ্চ মাধ্যমিকেও পিরোজপুর জেলার গড় পাসের হার ৫১.৫৫% সর্বোচ্চ, বরিশাল ৪৯.৯৫% নিয়ে দ্বিতীয়। বরগুনার পাসের হার ৪৪.৬৬% এবং ভোলার ৩৯.৫৪%। পটুয়াখালী ৩৮.৫১% এবং ঝালকাঠির পাসের হার ৩৭.০৯%।
বরিশাল বোর্ডে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। এবারে এসএসসি পরীক্ষায় ৮২,৯০২ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৮০,৪৫৮ জন অংশগ্রহণ করেছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩ হাজার কম। উচ্চ মাধ্যমিকেও অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২০২৪-এর ৬৬,০৮৭ থেকে ৫৯,২৩৯-এ নেমেছে। গত তিন বছরে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী সংখ্যা ৮ সহস্রাধিক কমে ৫৭,৯১২-এ পৌঁছেছে।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমিক পরীক্ষায় সর্বনিম্ন গ্রেডে পাসের হার ২.৩৩%, যা গত বছরের তুলনায় ১ ভাগ বেশি। উচ্চ মাধ্যমিকেও সর্বনিম্ন গ্রেডে পাসের হার ৩.০৩%। এই পরিসংখ্যান শিক্ষার মান নিয়ে সংশয় বাড়াচ্ছে। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্ছ্বাসের বন্যা দেখা গেলেও বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা চোখের পানি লুকাতে পারেননি। তবে অনেক অভিভাবক সন্তানের সাফল্যের খুশিতে কেঁদে ফেলেছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন