প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইরাকের রাজধানী বাগদাদের একটি ব্যস্ত সড়কে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া এক নারী প্রতিবাদ জানালে তাকে গাড়ির দরজা খুলতে বাধা দেন এক চালক। এই ঘটনাটি ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেন নারী অধিকারকর্মী সারা জাসিম। তার ইনস্টাগ্রাম পেজে প্রকাশিত ভিডিওগুলোতে ইরাকে নারীদের প্রতি যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।
জাসিমের উদ্দেশ্য হলো, নারীদের প্রতি হয়রানির ঘটনা আড়ালে না রেখে ভুক্তভোগীদের কথা সামনে আনা এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জোরালো করা। তবে এই কাজ করতে গিয়ে তিনি নানা ধরনের হুমকি ও সামাজিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। জাসিমের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে হত্যার পাশাপাশি এসিড হামলার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। নারীদের নীরব থাকার সামাজিক প্রত্যাশার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে জনসমক্ষে অশালীনতা ছড়ানোর অভিযোগও তোলা হয়েছে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে এখন তিনি খুব কমই বাড়ির বাইরে বের হন। দিনের অনেকটা সময় কাটে পোষা কুকুরের সঙ্গে। নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সরব হওয়ার কারণে তার স্বাভাবিক জীবনযাপনও সীমিত হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানান।
ইরাকে যৌন হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা মোকাবেলায় কঠোর আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন জাসিম। তার মতে, দেশটির প্রচলিত দণ্ডবিধিতে এসব অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা ও স্বীকৃতির ঘাটতি রয়েছে। ফলে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ জরুরি।
জাসিমের মতে, সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হলো তা স্বীকার করা। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধীদের এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যৌন হয়রানির শিকার নারীদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে জাসিম নিজেও এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
তিনি বলেন, এসব ভিডিও প্রকাশ করা তার নিজের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। ইরাকে যৌন নির্যাতনের শিকার অনেক নারী অভিযোগ করেছেন, সমাজে প্রায়ই নির্যাতনকারীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা হয়। এ ধরনের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীদের অভিযোগ জানানো ও ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে।
‘তোমাকে মেরে ফেললে কেউ শুনবে না’
ইরাকে যৌন নির্যাতনের শিকার অনেক নারী অভিযোগ করেছেন, তাদের সুরক্ষা দিতে পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে। অধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের মতে, যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। এ ছাড়া মামলার ফলাফল কী হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা থাকে।
নারীদের প্রতি বৈষম্যবিষয়ক জাতিসংঘের একটি কমিটির মে মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকে নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ব্যাপক, তবে অনেক ঘটনাই নথিভুক্ত হয় না। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আরো শক্তিশালী আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছে কমিটি। প্রতিবেদনে বৈষম্যমূলক আইন বাতিলেরও আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব আইনের আওতায় ধর্ষক ভুক্তভোগীকে বিয়ে করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাস্তি থেকে রেহাই পেতে পারে। পাশাপাশি তথাকথিত ‘সম্মান রক্ষার’ নামে হত্যার ঘটনায় শাস্তি কমানোর সুযোগও রয়েছে।
ইরাকের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার উদাহরণ আমালের ঘটনা। নিরাপত্তার কারণে তার আসল নাম প্রকাশ করা হয়নি। তিনি অভিযোগ করেছেন, তার সাবেক স্বামী অস্ত্রের মুখে তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বারবার ধর্ষণ করেছেন। এ ঘটনার বিচার চেয়ে প্রায় পাঁচ বছর ধরে আদালতে লড়ছেন তিনি। আমাল মেয়ের কাছ থেকে শোনা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে জানান, একবার তার সাবেক স্বামী মেয়ের ঘরে ঢুকে বিছানায় অস্ত্র রেখেছিলেন। এরপর মেয়েকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি তোকে মেরে ফেললেও কেউ তোর চিৎকার শুনতে পাবে না।’
ইরাকে যৌন নির্যাতন এখনো সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ একটি বিষয়। এ কারণে অনেক ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিক্রিয়া, সামাজিক অপমান ও হয়রানির ভয়ে নির্যাতনের কথা গোপন রাখেন। কেউ কেউ পুলিশের কাছেও যেতে সাহস পান না। তবে মেয়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগের বিচার পেতে আমাল শুরু থেকেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
আমাল জানান, তার মেয়ের কবজিতে অসংখ্য কালশিটে দাগ ছিল। সাবেক স্বামী মেয়েটির হাত শক্ত করে ধরে রাখতেন এবং চিৎকার করতে গেলে মুখ চেপে ধরতেন। আমাল তার অভিযোগের সমর্থনে ডিএনএ পরীক্ষার প্রমাণসহ চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিও দেখিয়েছেন।
আমালের দাবি, তার সাবেক স্বামী পরিবারের এক সদস্যকে বলেছিলেন, গ্রেপ্তার হলে যেন কেউ ‘কলঙ্ক মুছে ফেলে’। ইরাকে এ ধরনের কথা কখনো কখনো তথাকথিত ‘সম্মান রক্ষার’ নামে হত্যার ইঙ্গিত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আমালের আশঙ্কা, চিকিৎসা প্রতিবেদনে যৌন নির্যাতনের প্রমাণ প্রকাশ ঠেকাতেই তার মেয়েকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমাল বলেন, ‘আমি একাই লড়েছি।’ শেষ পর্যন্ত তার চাওয়া একটাই, ‘আমি শুধু চাই, সে যেন চিরদিনের জন্য আমার পথ থেকে সরে যায়।’
হত্যা
ইরাকে নিজ বাড়িতে যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় পাওয়া কঠিন। অনেকের নিজস্ব আয় নেই, আবার নির্যাতন থেকে বাঁচতে যাওয়ার মতো জায়গাও নেই। এর মধ্যে নারী অধিকারকর্মীদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
ইরাকে নির্যাতিত নারীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা খুবই কম। যেসব আশ্রয়কেন্দ্রের কথা জানা যায়, সেগুলোর কয়েকটির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত নারী অধিকারকর্মী ইয়ানার মোহাম্মদ। গত মার্চে বাগদাদে নিজের বাড়ির বাইরে সশস্ত্র ব্যক্তিদের হামলায় তিনি নিহত হন। এখন পর্যন্ত তার হত্যাকারীদের শনাক্ত করা যায়নি।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের বিশেষজ্ঞরা গত এপ্রিলে জানান, ইয়ানার মোহাম্মদ বছরের পর বছর ধরে প্রাণনাশের হুমকি ও অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। এসব হুমকি চরমপন্থী ধর্মীয় মিলিশিয়াদের কাছ থেকে এসেছিল বলে ধারণা করা হয়।
নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের সহকর্মীদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা বেড়েছে। বিশিষ্ট নারী অধিকারকর্মী হানা এডওয়ার জানান, নিহত হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে তিনি ইয়ানার মোহাম্মদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনিও হুমকি পেয়েছেন বলে জানান।
হানা এডওয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ইরাকে নারীদের জন্য কোনো আইন নেই, কোনো সুরক্ষা নেই, কোনো ন্যায়বিচারও নেই।’
ইরাকি মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রধান মুস্তফা সাদুনের মতে, ইরাকের মূল সমস্যা নারীদের নীরব থাকা নয়, বরং তারা কথা বললেও তাদের অভিযোগ শোনার ও প্রতিকার দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
তিনি বলেন, যৌন সহিংসতার অভিযোগ নিয়ে একজন নারীকে প্রথমে পরিবারের, এরপর পুলিশের এবং সবশেষে আদালতের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিটি পর্যায়েই তাকে অনেক সময় বিষয়টি প্রকাশ না করে আপস করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে নির্যাতিত নারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, আইনি সহায়তা এবং কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে। নারী অধিকারকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
গাড়িতে করে অনুসরণ
রাস্তায় হাঁটা কিংবা গণপরিবহনে যাতায়াত, ইরাকের অনেক নারীর কাছে এখন এসবও উদ্বেগের কারণ। যৌন হয়রানির শিকার হয়েও সামাজিক লজ্জা, পরিবারের বাধা ও পুলিশের কাছ থেকে সহায়তা না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে মুখ খুলতে চান না। ফলে দেশটিতে নারীদের নিরাপত্তা ও বিচার পাওয়ার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিবিসিকে সামিরা (ছদ্মনাম) নামের এক নারী জানান, একবার গণপরিবহনে এক ব্যক্তি তার সামনে ফোনে পর্নোগ্রাফি দেখান। আরেক দিন বাগদাদে এক ব্যক্তি গাড়ি নিয়ে ১০ মিনিটেরও বেশি সময় তাকে অনুসরণ করেন। পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েও তিনি সহায়তা পাননি বলে দাবি করেন।
পরিবারের কাছেও এসব ঘটনা প্রকাশ করতে ভয় পান সামিরা। তার আশঙ্কা, বিষয়টি জানালে নিরাপত্তার অজুহাতে তাকে বাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করা হতে পারে। অনেক পুরুষ এমনকি কিছু পুলিশ কর্মকর্তাও যৌন হয়রানিকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখেন না।
তবে ইরাকের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মুকদাদ মিরি বলেছেন, ‘পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও চাকরি থেকে বরখাস্তের বিধান রয়েছে।’ তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে পুলিশ প্রায় ৩০০টি যৌন সহিংসতার অভিযোগ পেয়েছে। তবে সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না বলেও স্বীকার করেন তিনি।
নারী অধিকারকর্মীদের মতে, সামাজিক কলঙ্ক, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ এবং বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তা নারীদের ন্যায়বিচার চাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা হানা এডওয়ারও দেশটিতে নারীদের অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবু হাল ছাড়তে রাজি নন নারী অধিকারকর্মীরা। নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং হয়রানির বিরুদ্ধে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করেন তারা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন