প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজশাহীর দুর্গাপুরে শীতের আগমন বার্তা আসার সাথে সাথে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। হেমন্তের শেষ ভাগ থেকে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের গাছিরা খেজুর গাছের পরিচর্যা, নির্দিষ্ট অংশ কাটা এবং রস সংগ্রহের জন্য হাঁড়ি বাঁধার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। শীতের সকালে খেজুরের মিষ্টি রস এবং সেই রস থেকে তৈরি পাটালি ও ঝোলা গুড়ের জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা অপেক্ষা করছেন। তবে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই পেশা টিকিয়ে রাখা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
উপজেলার দাওকান্দি, পানানগর, ঝালুকা ও জয়নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় গাছিরা খেজুর গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। কোমরে দড়ি বেঁধে গাছে উঠে তাঁরা নির্দিষ্ট অংশ ছেঁটে রস সংগ্রহের উপযোগী করছেন। সন্ধ্যায় গাছে মাটির হাঁড়ি বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। রাতভর সেই হাঁড়িতে জমছে খেজুরের রস, যা ভোরে সংগ্রহ করা হয়।
স্থানীয় প্রবীণ গাছি মো. সাহাজ আলী (৫০) জানিয়েছেন, এ বছর তিনি প্রায় ৮০টি খেজুর গাছ কেটেছেন। তিনি বলেন, "কার্তিক মাসের শেষ দিকে গাছ প্রস্তুত করলে রস ভালো পাওয়া যায়।" একটি গাছ থেকে দৈনিক দুই থেকে চার লিটার পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। সংগৃহীত রস দিয়ে তিনি খাঁটি পাটালি ও ঝোলা গুড় তৈরি করবেন।
তিনি আরও বলেন, "দুর্গাপুরের খেজুরের গুড়ের সুনাম রয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। শীতের মৌসুমে এ গুড়ের চাহিদা বাড়ে।" রস সংগ্রহ থেকে গুড় তৈরি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় গাছিদের দীর্ঘ পরিশ্রম করতে হয়।
দেশজুড়ে রয়েছে গুড়ের চাহিদা
স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, দুর্গাপুরের খেজুরের পাটালি গুড়ের চাহিদা রাজশাহী শহরের পাশাপাশি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে। শীতের মৌসুমে খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড় দিয়ে পিঠা-পুলি, পায়েসসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করা হয়। গ্রামবাংলার শীতকালীন খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে খেজুরের রস ও গুড় গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
একসময় গ্রামের বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে ও মাঠের পাশে সারি সারি খেজুর গাছ দেখা যেত। শীত এলেই গাছিদের কর্মব্যস্ততা, রস সংগ্রহ এবং গুড় তৈরির আয়োজন গ্রামীণ জীবনে ভিন্ন আমেজ সৃষ্টি করত। সময়ের পরিবর্তনে সেই পরিচিত দৃশ্য অনেক এলাকায় কমে আসছে।
কমছে খেজুর গাছ, শঙ্কায় ঐতিহ্য
গাছিদের অভিযোগ, আগের তুলনায় এলাকায় খেজুর গাছের সংখ্যা কমে গেছে। বিভিন্ন প্রয়োজনে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। কেউ কেউ ইটভাটাসহ অন্যান্য কাজে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে রস সংগ্রহের সুযোগ যেমন কমছে, তেমনি গাছিদের ঐতিহ্যবাহী পেশাও হুমকির মুখে পড়ছে।
গাছিরা জানান, খেজুর গাছ প্রস্তুত করা, নিয়মিত পরিচর্যা, রস সংগ্রহ এবং গুড় তৈরি—প্রতিটি ধাপেই শ্রম ও সময় দিতে হয়। তারপরও এ পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে খাঁটি খেজুরের রস ও গুড়ের সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে।
তাদের মতে, খেজুর গাছ সংরক্ষণ, নতুন গাছ রোপণ এবং গাছিদের উৎসাহিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা পাওয়া গেলে এ ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি গ্রামীণ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।
কাঁচা রস পানে সতর্কতার পরামর্শ
খেজুরের রস সংগ্রহ ও পান করার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত সতর্কতা জরুরি। বাদুড়ের মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় কাঁচা খেজুরের রস পান না করার পরামর্শ দেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। রস সংগ্রহের হাঁড়ি এমনভাবে ঢেকে রাখতে হবে, যাতে বাদুড় বা অন্য কোনো প্রাণী রসে মুখ দিতে না পারে। রস ভালোভাবে ফুটিয়ে পান করা তুলনামূলক নিরাপদ।
শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে দুর্গাপুরের গ্রামাঞ্চলে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কর্মযজ্ঞ আরও জমে উঠবে। গাছিদের ব্যস্ততা, ভোরের রস সংগ্রহ এবং খাঁটি গুড়ের মৌসুমি চাহিদায় মুখর হয়ে উঠবে গ্রামীণ জনপদ। তবে এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে খেজুর গাছ সংরক্ষণ ও নতুন গাছ রোপণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে একসময় গ্রামবাংলার শীতের অন্যতম পরিচিত অনুষঙ্গ খেজুরের রস ও গুড়ের ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন