প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নেপালের হিমালয়ের কোলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যা ও কাদা-পাথরের ধস বিশ্বব্যাপী নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তিব্বত সীমান্তের ল্যাংটাং অঞ্চলে হিমবাহের ধস অথবা দ্রুত পাহাড়ি ঢলের কারণে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তবে ভৌগোলিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নেপালের এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারতের জন্য এটি একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। পাহাড়ি ঢল এবং নদীগুলোর জলীয় গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, নেপালের পাহাড়ি ঢল ভারতের সমতল ভূমির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে নেপাল ও ভারতের সম্পর্ক নদীকেন্দ্রিক। নেপালে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ছয় হাজারের বেশি নদী ও পাহাড়ি ঝরনা রয়েছে, যার বেশির ভাগই দক্ষিণে ভারতের দিকে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা নদীতে মিশছে। কোশী, গণ্ডক, ঘাগরা এবং মহাকালী নদী উভয় দেশের সীমানা অতিক্রমকারী প্রধান নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম। এছাড়া শিওয়ালিক বা চুরে পর্বতমালা থেকে উৎসারিত বাগমাটি, কমলা বা রাপ্তির মতো ছোট নদীগুলোও অত্যন্ত খাড়া পাহাড়ি পথ বেয়ে নেমে আসে। বর্ষাকালে এগুলো অতি দ্রুত এবং ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞদের মতে, সাত থেকে নয়টি বড় নদী সরাসরি নেপাল থেকে ভারতের সমতল ভূমিতে প্রবেশ করে, যা ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বন্যার মূল উৎস।
এই ভৌগোলিক কাঠামোর কারণে ভারতীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে বিহার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভারতের সবচেয়ে বেশি বন্যাপ্রবণ এই রাজ্যের মোট ভূখণ্ডের তিন-চতুর্থাংশই প্লাবিত হয় নেপাল থেকে আসা নদীগুলোর কারণে। বিশেষ করে বিহারের দুঃখ নামে পরিচিত কোশী নদী প্রতি বছর বিশাল পলি ও পানি বহন করে নিয়ে আসে। শুধু বিহারই নয়, পার্শ্ববর্তী উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলো, যেমন গোলকপুর, বাহরাইচ কিংবা লাখিমপুর খেরিও ঘাগরা ও রাপ্তি নদীর কারণে নিয়মিত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উত্তরাখণ্ড ও উত্তরবঙ্গও একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
নেপালের ভারী বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় কীভাবে ভারতে বন্যায় রূপ নেয়, তা তিনটি ধাপে ঘটে। প্রথমত, হিমালয় পর্বতমালার নিচু অংশে অতিবৃষ্টির সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়ত, নদীর পানির গতিবেগ পর্বত অতিক্রম করে যখন সমতলে পৌঁছায়, তখন নদীগুলো গতিপথ পরিবর্তন করে পলি ছড়িয়ে দেয়। তৃতীয়ত, এই বিপুল পরিমাণ পানি যখন ভারতের সীমানায় প্রবেশ করে, তখন ভারতের স্থানীয় বৃষ্টিপাত, গঙ্গা নদীর পানির উচ্চতা এবং দুর্বল বাঁধ বা অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে।
২০০৮ সালে কোশী নদীর ভয়াবহ ট্র্যাজেডি তার বড় প্রমাণ। সে সময় নেপালের বৃষ্টিপাত বা নদীর পানি ক্ষমতার অতিরিক্ত ছিল না বরং পুরনো ও রক্ষণাবেক্ষণহীন বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণেই ভারতে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছিল। অর্থাৎ, সীমান্ত পর্যন্ত পানির গতি নির্ধারণ করে নেপালের প্রকৃতি, কিন্তু ভারতে তা কতটা ধ্বংসাত্মক হবে তা অনেকাংশে নির্ভর করে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর ওপর।
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে যে, নেপাল ইচ্ছে করে পানি ছেড়ে দিয়ে ভারতে বন্যা ঘটায়। তবে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নেপালে পানি আটকে রাখার মতো বিশাল কোনো কৃত্রিম জলাধার নেই। কোশী বা গণ্ডক নদীর ওপর নির্মিত ব্যারাজগুলোর নিয়ন্ত্রণ মূলত ভারতের হাতে থাকে। ফলে সীমান্ত অতিক্রমকারী পাহাড়ি ঢল সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক নিয়মে ভারতে পৌঁছায়। তবে এই পানি প্রবাহের সঙ্গে বিশাল পরিমাণ কাদামাটি, পাথর ও পলি যুক্ত হয়ে এক ধরনের ঘন তরল মিশ্রণ তৈরি করে, যা সাধারণ পানির বন্যার চেয়ে বহুগুণ বেশি বিপজ্জনক।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে উষ্ণতা ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে ক্ষিপ্র বৃষ্টিপাত, হিমবাহ ধস এবং আকস্মিক হরকা বান বহুগুণ বেড়ে গেছে। ভারতের চামোলি কিংবা ধারালির সাম্প্রতিক ট্র্যাজেডিগুলোর সঙ্গে নেপালের এই বিপর্যয়ের হুবহু মিল রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও নেপালের উচিত পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে রিয়েল-টাইম ডাটা শেয়ারিং, দ্রুত সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং যৌথ নদী ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া। তা না হলে হিমালয়ের এই অস্থির নদীপ্রবাহ সামনে দুই দেশের জন্যই আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
সূত্র: বিবিসি
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন