প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের ওলেশকি শহরে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আজ মঙ্গলবার ভোরে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত ৩টা থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা জানানো হয়েছে উভয় পক্ষের তরফ থেকে। তবে সংঘর্ষের তীব্রতা কমেছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা যাচাই করতে পারেনি এএফপি।
এদিকে, মঙ্গলবার ভোরে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রাজধানী কিয়েভের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে।
২০২২ সালে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর সময় ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলের যুদ্ধবিধ্বস্ত ওলেশকি শহরটি রুশ বাহিনীর দখলে চলে যায়। এরপর থেকে শহরটি যুদ্ধের মাঝখানে আটকা পড়েছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শহরটির সাবেক বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সেখানে থেকে যাওয়া মানুষজন খাদ্যসংকটে ভুগছেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না এবং সহজে শহর ছেড়ে যাওয়ার সুযোগও তাদের নেই।
মঙ্গলবার রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।
মন্ত্রণালয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রাম চ্যানেলে বলেছে, ‘খেরসন অঞ্চলের ওলেশকি এলাকায় একটি মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে (রুশ বাহিনী) খেরসন রণাঙ্গনে গোলাবর্ষণ বন্ধ করেছে ও ‘নীরবতা বজায় রাখার ব্যবস্থা’ চালু করেছে।’
ইউক্রেনের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনার দিমিত্রো লুবিনেৎস জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি মেনে চলার ক্ষেত্রে ইউক্রেন তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে তিনি বলেন, ‘আমরা যে সমঝোতায় পৌঁছেছি এবং উভয় পক্ষই তা মেনে চলছে।’
সীমিত একটি এলাকায় কার্যকর হওয়া এই যুদ্ধবিরতি এমন সময়ে শুরু হলো, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে।
কয়েক মাসের বিরতির পর আগামী নভেম্বরে ওয়াশিংটন, মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা আবারও শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব কারা পালন করবে কিংবা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবিক সহায়তা কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র— কোনো পক্ষই বিস্তারিত জানায়নি।
গত শুক্রবার যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করার ঘোষণা দিয়ে মেলানিয়া ট্রাম্প বলেছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের বেসামরিক কর্মকর্তারা শহরটির বাসিন্দাদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলবেন এবং তাদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করবেন।
তিনি বলেন, ‘যেসব বাসিন্দা শহর ছেড়ে যেতে চান, তাদের পছন্দের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে সমন্বিত সহায়তা ও পরিবহনের ব্যবস্থা করা হবে। আমার ধারণা, তাদের কেউ রাশিয়ায় যেতে চাইবেন, আবার কেউ ইউক্রেনে ফিরতে চাইবেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী টেলিভিশন নেটওয়ার্ক নিউজম্যাক্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার শহরটিতে প্রবেশকারী পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে গিয়ে প্রতিবেদন তৈরির জন্য তারা ‘এক্সক্লুসিভ টেলিভিশন সম্প্রচারের সুযোগ’ পেয়েছে।
যুদ্ধবিরতি কত দিন স্থায়ী হবে, সে বিষয়ে রাশিয়া বা ইউক্রেন— কোনো পক্ষই কিছু জানায়নি।
শুক্রবার রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, যুদ্ধবিরতি চলাকালে খেরসন রণাঙ্গনে গোলাবর্ষণ বন্ধ রাখা হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
রাশিয়ার সেনাপ্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভের বক্তব্য উদ্ধৃত করে মন্ত্রণালয়টি বলেছিল, ‘জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অত্যাবশ্যকীয় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য... খেরসন অঞ্চলের ওলেশকি শহরে একটি মানবিক ত্রাণবাহী বহরকে নিরাপদে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে।’
ইউক্রেনের অভিযোগ, রাশিয়া শহরটির বাসিন্দাদের সেখান থেকে বের হতে বাধা দিচ্ছে। তবে মস্কো এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
দনিপ্রো নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ওলেশকি শহরটি ২০২২ সালে রুশ সেনারা দখল করে নেয়।
ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার আগ্রাসনের আগে শহরটিতে প্রায় ২৪ হাজার মানুষ বসবাস করতেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে প্রায় দুই হাজারে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০ জন শিশু রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাশিয়ার মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনার ইয়ানা লানত্রাতোভা সোমবার দাবি করেন, শহর ছেড়ে যেতে ইচ্ছুক অধিকাংশ মানুষ ইতোমধ্যেই চলে গেছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তারা সবাই ‘সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়’ শহর ছেড়েছেন।
তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শহরটির সাবেক বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সেখানে থেকে যাওয়া মানুষজন অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন।
ওলেশকিতে অবস্থানরত দুটি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ওলগা নামের এক নারী বলেন, ‘তারা রুটির কথাই ভুলে গেছে। রুটি বানাতে ময়দা লাগে, অথচ সেখানে এখন ময়দাও নেই।’
২০২৩ সালে কাখোভকা বাঁধ ধ্বংস হয়ে দনিপ্রো নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ বন্যার ঘটনায় শহরটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শুক্রবার ইউক্রেনের সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, ওলেশকির বাসিন্দাদের সহায়তা করতে তারা ‘সর্বাত্মক চেষ্টা’ চালাবে এবং নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও উদ্ধার নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী প্রকাশিত ড্রোনের ভিডিওচিত্রে শহরটিতে সারি সারি ফাঁকা আবাসিক ভবন দেখা গেছে। কয়েকটি ভবন আগুনে পুড়ে গেছে, আবার কিছু ভবন সংঘর্ষে আংশিক ধ্বংস হয়েছে।
অন্য কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ ড্রোনের মাধ্যমে শহরে থেকে যাওয়া বাসিন্দাদের কাছে ওষুধ ও খাবার পৌঁছে দিচ্ছে।
রাশিয়ার সামরিক বাহিনী সাধারণত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে তাদের দখলে থাকা এলাকাগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দেয় না। ওলেশকিও এর ব্যতিক্রম নয়।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এ যুদ্ধে কয়েক লাখ সেনা ও বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসা রাশিয়া বর্তমানে প্রতিবেশী ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০১৪ সালে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে নেওয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ, পূর্বাঞ্চলের দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা—যা সম্মিলিতভাবে দনবাস নামে পরিচিত—এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন অঞ্চলের বড় অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি আলোচনা আগামী নভেম্বরে আবারও শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে কার্যত এ আলোচনা স্থবির হয়ে ছিল।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন