প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন, সরকারি পুকুর ও সার ডিলারশিপ বণ্টনে অনিয়ম এবং উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগ সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডলের বিরুদ্ধে উঠেছে। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন যে, এমপির এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলার ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এমনকি দলীয় পদ থেকে বহিষ্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সোমবার দুপুরে রাজশাহী মহানগরীর একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করে এসব অভিযোগ উত্থাপন করেন ‘রাজশাহী-৫ আসনের ভুক্তভোগী বিএনপির নেতাকর্মীরা’। তাঁরা সংবাদ সম্মেলন থেকে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা, নেতাকর্মীদের নামে করা মামলা প্রত্যাহার এবং পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলামের অপসারণ ও প্রত্যাহার দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পুঠিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক দেলোয়ার সরকার আল-আমীন। এছাড়া বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে বক্তব্য দেন বানেশ্বর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম নবী ও সাবেক ছাত্রনেতা আহসান হাবিব।
লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, সম্প্রতি সংসদ ভবনে সরকারপ্রধান/প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎ করাতে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে পুঠিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পল্লব সেনগুপ্ত ও আওয়ামী লীগকর্মী মাজহারুল ইসলাম মিন্টুকে নিয়ে যান এমপি নজরুল ইসলাম মন্ডল। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা এভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শীর্ষ পর্যায়ের সাক্ষাতে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁরা এ ঘটনায় নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রশ্ন তুলেছেন।
অভিযোগকারীদের মতে, এমপির আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কেবল রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্থানীয় দলীয় কার্যক্রম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর ওপর এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে।
বিএনপি নেতারা পুঠিয়া-দুর্গাপুরের সরকারি পুকুর ইজারা ও মাছ চাষের ব্যবস্থা নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এলাকার অধিকাংশ সরকারি পুকুর আওয়ামী লীগের এক অর্থদাতাকে দিয়ে চাষ করানো হচ্ছে।
এছাড়া এমপির সুপারিশপত্রে পছন্দের ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয় সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পুঠিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট রিশাদ হোসেন কেতাব এবং পুঠিয়া পৌরসভা এলাকায় শাহেদ হাসানকে সার ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। শাহেদ হাসানের বাড়ি ময়মনসিংহে উল্লেখ করে তাঁকে এমপির ‘নাতিজামাই’ বলে দাবি করা হয়। অন্যদিকে ভাল্লুকগাছি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া শফিউল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
নেতারা এসব নিয়োগের পেছনে রাজনৈতিক পরিচয়, আত্মীয়তা কিংবা কোনো আর্থিক লেনদেনের প্রভাব রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
এলাকার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদ গঠন নিয়েও স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়। বিএনপি নেতাদের দাবি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে এমপির পরিবারের সদস্য, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সভাপতি ও সদস্য করা হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি ও দলীয় অনুদান, ঈদ উপলক্ষে বিশেষ বরাদ্দ এবং উন্নয়নকাজের থোক বরাদ্দ কোথায় কীভাবে ব্যয় হচ্ছে—তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে না। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার কারণেই দুর্গাপুর পৌর ছাত্রদল ও যুবদলের চার নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করানো হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
নিজের বিরুদ্ধে করা মামলার প্রসঙ্গ টেনে যুবদল নেতা দেলোয়ার সরকার আল-আমীন বলেন, এমপির বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত বা মন্তব্য প্রকাশ করলেই দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
তিনি জানান, গত ১৩ আগস্ট বিড়ালদহ পশ্চিমপাড়া গ্রামের একটি পারিবারিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁকেসহ বিএনপির নয়জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। উক্ত ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না দাবি করে দেলোয়ার বলেন, কেবল রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করতেই এই মামলা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া গত ১১ অক্টোবর চারজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এসব মামলার পেছনে সংসদ সদস্যের প্রত্যক্ষ চাপ রয়েছে এবং পুঠিয়া থানার ওসি তাঁকে সহযোগিতা করছেন বলে দেলোয়ার অভিযোগ করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, মামলার বাদী খন্দকার সোহেল মাহমুদ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। প্রমাণ হিসেবে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হাবিব খানের সঙ্গে সোহেলের একটি ছবি প্রদর্শন করেন দেলোয়ার। তাঁর দাবি, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কসহ কয়েকজন নেতা ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করলে ওসি স্পষ্ট জানান যে, সংসদ সদস্যের চাপ থাকার কারণেই তিনি মামলা নিতে বাধ্য হয়েছেন।
সাবেক ছাত্রনেতা আহসান হাবিব বলেন, রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিব খান হলেন এমপির ভাতিজা আজাদ মন্ডলের জামাতা। তাঁর অভিযোগ, হাবিব খান শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করে সরকার পতনের হুমকি দিচ্ছেন। এ বিষয়ে স্থানীয় এমপি কী পদক্ষেপ নিয়েছেন—তা জানতে চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার পর তাঁকেও মামলা দিয়ে হয়রানি শুরু করা হয়।
আহসানের প্রশ্ন, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বললে কেন বিএনপির নেতাকর্মীদেরই মামলার মুখোমুখি হতে হবে?
‘ভিন্নমত পোষণে হয়রানির শিকার’
বানেশ্বর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম নবী বলেন, নির্বাচনের আগে পুঠিয়া-দুর্গাপুর আসনে নজরুল ইসলাম মন্ডল ছাড়াও বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতা ছিলেন। যাঁরা তৎকালীন সময়ে তাঁর সমর্থক ছিলেন না, তাঁদেরকেই এখন বেছে বেছে হয়রানি করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি দলের ভেতরে ভিন্নমত দমনের এক ভয়াবহ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে পুনরায় উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত, প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং পুঠিয়া থানার ওসি ফরিদুল ইসলামের অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার ও অপসারণ দাবি জানানো হয়।
প্রতিক্রিয়া
অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর ভাতিজা তানজিম আরিন ফোন রিসিভ করেন। তিনি জানান, সংসদ সদস্য বর্তমানে বিশ্রামে আছেন।
এমএইচ
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন