প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জাতীয় বাজেট একেবারেই কেবল আয়-ব্যয়ের একটি হিসাব নয়; বরং এটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি প্রতিফলন। নির্বাচনের পর প্রথম বাজেটে সাধারণত বিশেষ গুরুত্ব থাকে, কারণ এর মধ্যে নতুন সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের একটি রূপরেখা তুলে ধরে।
আমদানি-রপ্তানির পরবর্তী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটও সেই অর্থে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা বহন করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উচ্চাভিলাষী বাজেটের অর্থায়ন কতটা বাস্তবসম্মত?
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। আর সেই তুলনায় নতুন বাজেটের আকার প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
সাধারণভাবে বাজেটের আকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে বৃদ্ধি পায়। এ কারণে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়ের উৎস কি সরকার নিশ্চিত করতে পারবে?
এই বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিঃসন্দেহে অর্থের সংস্থান। আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। বাস্তবতা হলো, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় পাঁচ লাখ কোটি টাকাও অতিক্রম করবে না বলে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা।
অর্থাৎ প্রকৃত আদায় এবং আগামী বছরের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ব্যবধান প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা।
এছাড়া উদ্বেগের বিষয় হলো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আগামী অর্থবছরে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রকৃত আদায় ছিল মাত্র তিন লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সংস্থাটির রাজস্ব ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ফলে এই বাস্তবতায় রাজস্ব আদায়ে প্রায় দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলেই মনে হচ্ছে।
সমস্যা শুধু রাজস্ব বিষয়েই নয়, বাজেটের ব্যয় কাঠামোও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ‘‘ফ্যামিলি কার্ড’’ কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে মাসিক ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষক সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ অবশ্যই একটা ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, বরাদ্দ বৃদ্ধি সব সময় উন্নত সেবা নিশ্চিত করে না। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের তুলনায় বাস্তবায়নের সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা নতুন বরাদ্দের কার্যকারিতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
একই সময়ে সরকারকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের ভর্তুকির চাপও বহন করতে হবে। কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক এবং সামাজিক চাপ রয়েছে। ফলে একদিকে ভর্তুকি ব্যয়, অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয়, দুই দিক থেকেই সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়বে।
অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে সরকার দেশি এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। কিন্তু এখানে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ এবং সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামেনি। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। কিন্তু একই সময়ে যদি সরকার সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি গ্রহণ করে, তাহলে নীতিগত সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়বে।
বাজেটের সাফল্য কখনোই তার আকার দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং রাজস্ব আহরণের সক্ষমতাই একটি বাজেটের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা আছে, কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও উপেক্ষা করা যায় না।
নতুন বাজেট নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। এতে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ইতিবাচক লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনের পূর্বশর্ত হলো টেকসই অর্থায়ন। রাজস্ব সংগ্রহে মৌলিক সংস্কার, ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত না করা গেলে এই বৃহৎ বাজেট অর্থনীতির জন্য প্রত্যাশিত সুফলের পরিবর্তে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে আগামী অর্থবছরে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাজেট ঘোষণা নয়, বরং এর অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। এছাড়া বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেখা গেছে, বরাদ্দের অভাবে নয়, বরং দুর্বল পরিকল্পনা, ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে অনেক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। ফলে আগামী বাজেটে অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হবে।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন