প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) সাবেক উপাচার্য স্বদেশ চন্দ্র সামন্তের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের ছেলেসহ একাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম করেছেন। মামলায় সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সন্তোষ কুমার বসুকেও আসামি করা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ অনুসারে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন ছাড়া এবং নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত পদের অতিরিক্ত পদে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগের মাধ্যমে সরকারের ৮০ লাখ ৭৫ হাজার ১৩১ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলাটি রোববার (২৫ অক্টোবর) দুদকের পটুয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে দায়ের করা হয়।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে যেসব অভিযোগ
দুদক সূত্রে জানা গেছে, স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত ও সন্তোষ কুমার বসুর বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় মামলা করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, দুই আসামি পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধমূলক অসদাচরণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবল নিয়োগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসির অনুমোদন ছিল না। একই সঙ্গে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত পদের চেয়েও অতিরিক্ত পদে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, সাবেক উপাচার্যের ছেলেসহ অন্যান্যদের নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাছাই বোর্ডের সদস্যদের অবৈধভাবে প্রভাবিত করা হয়েছিল। রিজেন্ট বোর্ডের রেজুলেশন তৈরি ও অনুমোদন করা হয়েছিল।
৮০ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, অভিযোগে উল্লিখিত নিয়োগগুলোর বিপরীতে বেতন-ভাতা বাবদ মোট ৮০ লাখ ৭৫ হাজার ১৩১ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। কমিশনের অভিযোগ, এই অর্থ ব্যয়ের ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে তদন্তের ক্ষেত্রে নিয়োগের অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট পদগুলোর বৈধতা, বাছাই বোর্ডের কার্যক্রম, রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং বেতন-ভাতা পরিশোধের নথি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
জবাবদিহির প্রশ্ন
সরকারি অর্থে পরিচালিত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনুমোদিত পদ, নির্ধারিত যোগ্যতা ও প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দুদকের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলতে পারে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি) যেন একটি পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে ২৫ দম্পতি ও বিভিন্ন পরিবারের সদস্যরা শিক্ষক ও কর্মকর্তা পদে কর্মরত আছেন। কারও ছেলে, কারও মেয়ে, কারও ভাই, কারও বোন, কারও শ্যালক, কারও শ্যালিকা, কারও শ্বশুর, কারও জামাতা, কারও ননদ, কারও জা কর্মরত এখানে। সর্বশেষ ২ ডিসেম্বর'২০২৪ সেকশন অফিসার পদে উপাচার্য অধ্যাপক স্বদেশ চন্দ্র সামন্তের ছেলেসহ বিভিন্ন পদে কয়েকজন কর্মকর্তার স্বজন নিয়োগ পেয়েছেন।
পবিপ্রবি শিক্ষক সমিতি এবং যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ না পাওয়া সাবেক শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ২ ডিসেম্বর'২০২৪ বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ড তৎকালীন উপাচার্যের ছেলেসহ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী পদে মোট ৫৮ জনকে নিয়োগ দেয়। তবে ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর এবং এর আগের কয়েকটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে মোট পদ ছিল ৩৯টি। ২০২২ সালের ১৭ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে সেকশন অফিসার পদে তিনজনকে নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে ২ ডিসেম্বর'২০২৪ নিয়োগ পান ছয়জন।
তাঁরা হলেন তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক স্বদেশ চন্দ্র সামন্তের ছেলে শাওন চন্দ্র সামন্ত তনু, পবিপ্রবি কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি সাইদুর রহমান জুয়েলের ছোট ভাই মো. আরিফুর রহমান পিয়েল, সহকারী রেজিস্ট্রারের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা, পবিপ্রবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তারেকের বড় ভাই মো. হাফিজুর রহমান, দুমকী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালামের ছেলে তানভীর হাসান স্বাধীন, অপরজন তাকছিনা নাজনীন নামের এক নারী।
২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে ইউজিসির করা অর্গানোগ্রামে পবিপ্রবিতে সেকশন অফিসারের পদ ৩০টি। তবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৪৮ জন সেকশন অফিসার।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে ইউজিসির অনুমোদন না নিয়েই পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগে ১ জন প্রভাষক নিয়োগের উল্লেখ করা হয়। সমালোচনার মুখে ওই পদে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করা হলেও নতুন বিজ্ঞপ্তি না দিয়েই ২ ডিসেম্বর'২০২৪ দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের একজন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি কামরুজ্জামান সোহাগের স্ত্রী শেখ তানজিলা ইসলাম দোলা।
২০২২ খ্রিষ্টাব্দের ১১ অক্টোবর ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ ও অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড সিস্টেম ইনফরমেশন বিভাগ এবং ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে তিনজন প্রভাষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। তবে মেধাতালিকায় ৭ শতাংশের মধ্যে থাকা পবিপ্রবির সাবেক শিক্ষার্থীদের কেউ ভাইভা কার্ড না পাওয়ায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ১৯ নভেম্বর ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ ও অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড সিস্টেম ইনফরমেশন বিভাগের নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করে বিধিমালা অনুযায়ী নিয়োগের দাবিতে রেজিস্ট্রার বরাবর স্মারকলিপি দেন।
এতে সেদিনই ওই বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ স্থগিত করা হয়। তবে ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয় ল্যান্ড রেকর্ড অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক সাউদ বিন আলমের (প্রতীক) স্ত্রী আমিনা সারওয়ারকে।
এ দিকে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) বিতর্কিত শিক্ষক সন্তোষ কুমার বসুকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৫ হাজার ছাত্র হত্যার হুমকি ও আন্দোলন চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং শিক্ষার্থীদের হল থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বিতর্কিত মন্তব্যে তোপের মুখে পড়েন সাবেক রেজিস্ট্রার সন্তোষ কুমার বসু। একইসাথে তার কয়েকটি অডিও ক্লিপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেসবুক গ্রুপসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পেজে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। যা নিয়ে সাবেক রেজিস্ট্রার সন্তোষ কুমার বসুর বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অজানা কারণে এখনো স্থায়ীভাবে তাকে বরখাস্ত না করায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন