প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কক্সবাজারে সার সংকট যেন কাটছেই না। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কৃষকরা সরকারের নির্ধারিত দামে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে চরম হতাশা ও ক্ষোভের মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে রামু, উখিয়া ও টেকনাফে ইউরিয়া সারের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কৃষকদের অভিযোগ, বরাদ্দ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়মের পাশাপাশি একটি সিন্ডিকেটের কৃত্রিম সংকট এবং সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে সার পাচারের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দাবি, জেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দিয়েও অনেক এলাকায় সার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও সার কেনাকে কেন্দ্র করে কৃষক ও ডিলারদের মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনাও ঘটছে।
কক্সবাজারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরি বৃহস্পতিবার সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সার পাচার নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, "সরকার পর্যাপ্ত পরিমাণ সার সরবরাহ করছে। তবে বরাদ্দ ও বিতরণে কোথাও কিছুটা এদিক-সেদিক হয়ে থাকলে তা দ্রুত বন্ধ করতে হবে।" কৃষকের প্রাপ্য সার যাতে কোনোভাবেই পাচার বা অবৈধভাবে অন্যত্র চলে না যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কক্সবাজারের জন্য বরাদ্দ করা সার সীমান্তবর্তী কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে অবৈধভাবে মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। উখিয়া ও টেকনাফের কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্টে প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ এ পাচারের সঙ্গে জড়িত বলেও অভিযোগ উঠেছে। উখিয়ার বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "কিছু ক্ষমতাসীন দলের নেতা যদি সার পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে অন্যদের বিষয়ে বলার কী থাকে?"
সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে ইতোমধ্যে জেলার তিনজন ডিলারের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। পাশাপাশি কক্সবাজারের জন্য বরাদ্দকৃত সারের বস্তায় জেলার সিল ব্যবহারের দাবী জানান তিনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে অন্য জেলার বরাদ্দের সার কক্সবাজারে এনে সীমান্তপথে পাচারের সুযোগ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
বৃহষ্পতিবার জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে এক সভায় সার সংকট ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় কক্সবাজার-৩ আসনের এমপি লুৎফুর রহমান কাজল ইউনিয়নভিত্তিক নয়, কৃষকের সংখ্যা বিবেচনায় সার বরাদ্দ দেওয়ার পরামর্শ দেন। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, জেলার ১০ উপজেলায় প্রায় ২৩ হাজার কৃষক কার্ডের আওতায় সার বরাদ্দের ব্যবস্থা রয়েছে।
সভায় সার পাচার রোধে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়। বলা হয়, সারের সার্বিক সংকট না থাকলেও বরাদ্দ ও বিতরণ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা অপব্যবহার যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক জানান, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসে জেলার বোরো মৌসুমে মোট ৪ হাজার ৭৫ মেট্রিক টন সারের চাহিদার বিপরীতে সমপরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া ২ হাজার ৩৪৩, টিএসপি ৪৭৫, ডিএপি ৮৮৯ এবং এমওপি ৩৬৮ মেট্রিক টন।
গতকাল পর্যন্ত জেলার গুদামগুলোতে চার ধরনের সারের মোট ১ হাজার ৭৮৭ মেট্রিক টন মজুদ রয়েছে বলেও জানান তিনি। কৃষি বিভাগের এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী জেলায় সারের ঘাটতি থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে রামুর গর্জনিয়া ও কচ্ছপিয়ায় সার সংগ্রহ করতে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে ডিলারদের হাতাহাতি এমনকি মারামারির ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। উখিয়া ও টেকনাফের কয়েকটি সীমান্তপথে নিয়মিত ইউরিয়া সার পাচারের অভিযোগও রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে সার আটকের পরও পাচার পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
ঝিলংজা ও পিএমখালীর কয়েকজন কৃষক জানান, সরকার নির্ধারিত মূল্যে ইউরিয়া প্রতি কেজি ২৭ টাকা এবং ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা। কিন্তু বাজারে তাদের ৩০ থেকে ৩৩ টাকা কেজি দরে ইউরিয়া কিনতে হচ্ছে। ৫০ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিএপি ও এমওপি সারেও একই পরিস্থিতি। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় অতিরিক্ত দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার পাওয়া যাচ্ছে না।
রামুর গর্জনিয়ার কৃষক আবুল কাশেম ও জসিম উদ্দিন বলেন, জমিতে নির্দিষ্ট সময়ে সার প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ডিলাররা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য পরিমাণ সার দিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, "৫ কেজি নাও" বলা হচ্ছে। প্রয়োজনমতো সার প্রয়োগ করতে না পারলে এবার ধানের ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সার সংকটের কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কৃষক ও ডিলারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার প্রকৃত সারের চাহিদা নিরূপণের ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। কৃষি বিভাগের নিয়মিত ফসলের পাশাপাশি কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় তামাক চাষ, মৎস্য ঘের, পানের বরজ, ছাদবাগান এবং বন বিভাগের ফলজ ও বনজ বনায়নেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার ব্যবহার হয়। কিন্তু এসব খাতের সার চাহিদা যথাযথভাবে হিসাবের আওতায় না আসায় প্রকৃত চাহিদা ও বরাদ্দের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
এর সঙ্গে রয়েছে পরিবহন ব্যয়, বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, গুজব ছড়িয়ে অতিরিক্ত সার মজুদের প্রবণতা এবং সীমান্ত দিয়ে পাচারের অভিযোগ। সব মিলিয়ে মাঠপর্যায়ে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম বলেন, চট্টগ্রাম থেকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সার পরিবহনে প্রতি ৫০ কেজির বস্তায় ৬০ থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। বিসিআইসি বাফার গুদাম স্থাপন করা গেলে এ ব্যয় কমে ২০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে আসতে পারে।
তিনি জানান, চট্টগ্রাম সার কারখানা থেকে টেকনাফের দূরত্ব ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি। কুতুবদিয়ায় সার পরিবহনে ডিলারদের চারবার পর্যন্ত লোড-আনলোড করতে হয়। এর সঙ্গে গুদাম ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংক সুদসহ অন্যান্য খরচ রয়েছে। অথচ ২০০৯ সালে নির্ধারিত কেজিপ্রতি দুই টাকা কমিশনেই ডিলারদের ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে অনেক ডিলার লোকসানের মুখে পড়ছেন।
তার মতে, কক্সবাজারে দ্রুত বিসিআইসি বাফার গুদাম স্থাপন এবং দূরত্ব বিবেচনায় ডিলারদের কমিশন পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ডিলারদের সার বিক্রি তদারকির জন্য উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিলারদের বিরুদ্ধে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বেশি দামের প্রতিবাদ করলে কোনো কোনো কৃষককে সার না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এতে কৃষক ও ডিলারদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে এবং বিভিন্ন এলাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। সারের সংকট ও পাচারের অভিযোগ সম্পর্কে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, জেলায় সারের ঘাটতি নেই। বাজার মনিটরিংয়ের জন্য টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
মিয়ানমারে কৌশলে সার পাচারের বিষয়ে তিনি বলেন, উখিয়া ও টেকনাফে সার বিক্রির ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারি রয়েছে। প্রত্যেক ডিলারকে সার বিক্রির পর রেজিস্টারের পাশাপাশি অনলাইনে বিক্রির তথ্য আপডেট করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী সার বিক্রি না করলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষকদের মতে, শুধু কাগজে-কলমে বরাদ্দ দেখালে চলবে না; মাঠপর্যায়ে প্রকৃত কৃষকের হাতে নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে সার পাচার, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, কালোবাজারি ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোরো মৌসুমে নির্দিষ্ট সময়ে জমিতে সার প্রয়োগ করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। তাই কৃষির স্বার্থে সারের প্রকৃত চাহিদা পুনর্নিরূপণ, প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সীমান্তে নজরদারি জোরদার এবং ডিলার পর্যায়ে কঠোর মনিটরিং এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন