প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন আসন্ন হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য ও সিদ্ধান্তগুলো নতুন রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। ৫ হাজার ডলারের অর্থপ্রদানের প্রতিশ্রুতি, দুর্যোগ সহায়তা নিয়ে মন্তব্য, সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত করা, ২০২৪ সালের হত্যাচেষ্টা নিয়ে অভিযোগ এবং বিভিন্ন নীতিগত অবস্থান এসব বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সিএনএনের একটি বিশ্লেষণে গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বর রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্মেলনে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যদি তাঁর দল প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫ হাজার ডলারের ‘ডিভিডেন্ড’ প্রদান করা হবে। তবে অর্থের উৎস ও বিতরণের পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা দেননি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনসহ নানা আইনি ও আর্থিক বিষয় জড়িত।
এর আগে ট্রাম্প শুল্ক থেকে পাওয়া অর্থের ভিত্তিতে ২ হাজার ডলারের অর্থপ্রদানের কথাও বলেছিলেন। নতুন ৫ হাজার ডলারের প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও অর্থায়নের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবটির সম্ভাব্য ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে এবং এর বাস্তবায়নে কংগ্রেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলির প্রচারণায় গিয়ে ট্রাম্প দুর্যোগ সহায়তা নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ওই প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী না হলে রাজ্যটিতে অতিরিক্ত দুর্যোগ সহায়তা প্রদান করা হবে। পরে তিনি এটিকে রসিকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং জানান যে সহায়তা প্রদান করা হবে। এই মন্তব্য সরকারি সহায়তা ও নির্বাচনী প্রচারণার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন উপলক্ষে ট্রাম্প ভোটারদের তাঁর সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ভোটারদের এমনভাবে ভোট দিতে বলেছেন যেন তিনি নিজেও ব্যালটে রয়েছেন। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের কংগ্রেস নির্বাচনে রিপাবলিকান দলকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বানে ট্রাম্প নিজেকে প্রচারণার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে তুলে ধরছেন।
২০২৪ সালে পেনসিলভানিয়ার বাটলারে তাঁর হত্যাচেষ্টার ঘটনা ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এক পোস্টে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন না করেই ঘটনাটিকে ‘ডেমোক্র্যাটদের ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেন। তবে প্রকাশ্যে তদন্তে হামলাকারী থমাস ক্রুকসের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের কোনো সংগঠিত সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রয়টার্সের আগের যাচাইয়েও ঘটনাটিকে ঘিরে বিভিন্ন ভিত্তিহীন দাবি শনাক্ত করা হয়েছিল।
৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে ট্রাম্পের নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও ২০০১ সালের হামলার ঘটনাবলি ও তাঁর ব্যক্তিগত উপস্থিতির বিস্তারিত যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এ কারণে ট্রাম্পের বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য আলাদা করে দেখা জরুরি।
হোয়াইট হাউসে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার নিয়েও নতুন করে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকোকে হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন। পরদিন এসব সংবাদমাধ্যমের কয়েকজন সাংবাদিককে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি এবং তাঁদের প্রেস পাস অকার্যকর বা প্রত্যাহার করা হয়। সংবাদমাধ্যমগুলো এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছে এবং হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন প্রবেশাধিকার পুনর্বহালের আহ্বান জানিয়েছে।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিবেদন দেখানো হয়নি। তিনি বলেছেন, কয়েক বছরের সম্মিলিত সংবাদ কভারেজের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও সংবাদমাধ্যমকে নিষিদ্ধ করা হতে পারে। সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকো জানিয়েছে, তারা সংবাদ সংগ্রহের অধিকার রক্ষায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়েও সম্প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তাঁর নিয়োগ দেওয়া কয়েকজন বিচারপতি বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অবস্থানের বিপরীতে রায় দেওয়ার পর তিনি তাঁদের নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছেন। এ বিষয়টি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিচার বিভাগের সম্পর্ক এবং বিচারপতিদের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
আয়ারল্যান্ড সফরের সময় ট্রাম্প দেশটির পুনঃএকত্রীকরণের সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখার কথা বলেন। ১২ সেপ্টেম্বর ডাবলিনে তিনি বলেন, তিনি আয়ারল্যান্ডকে ঐক্যবদ্ধ দেখতে চান এবং একসময় তা ঘটবে বলে মনে করেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, উত্তর আয়ারল্যান্ডের অবস্থান নিয়ে যুক্তরাজ্যেরও মতামত গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও ট্রাম্পের অবস্থান আলোচনায় এসেছে। ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ‘এআই ফোর্স’ গঠনের ঘোষণা দেন এবং নতুন একজন এআই উপদেষ্টা নিয়োগের কথা জানান। তবে উদ্যোগটির কাঠামো, দায়িত্ব ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানাননি। একই সময়ে এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে গবেষক ও প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন মহল সতর্কতা জারি করে আসছে।
কেনেডি সেন্টার নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আইনি বিরোধ চলছে। ট্রাম্পের নাম ভবনের সম্মুখভাগে যুক্ত করার উদ্যোগ আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর একটি ফেডারেল বিচারক ওই নাম যুক্ত করার পরিকল্পনা স্থগিত করার আদেশ দেন। এর পর কেন্দ্রটির পরিচালনা পর্ষদ প্রায় ২৫৭ মিলিয়ন ডলারের সংস্কারকাজের জন্য প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়; ট্রাম্প আদালতের সিদ্ধান্ত বদল না হলে সংস্কারকাজে বাধা দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইরান যুদ্ধও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তিনি যুদ্ধের অবসান নিয়ে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন এবং সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে বলেন, সংঘাত বছরের শেষের দিকে শেষ হতে পারে, এমনকি মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও তা চলতে পারে। যুদ্ধের প্রভাব জ্বালানি বাজার, মার্কিন সামরিক ব্যয় ও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পড়ছে।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিয়েও সাম্প্রতিক জরিপে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রয়টার্স-ইপসস জরিপে তাঁর কাজের অনুমোদন ৩৫ শতাংশ ছিল। একই জরিপে ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রাম্পের ৫ হাজার ডলারের অর্থপ্রদানের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। এই জরিপ নির্দিষ্ট সময়ের জনমতকে প্রতিফলিত করে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে ফলও বদলাতে পারে।
এদিকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বিরোধ, ইরান যুদ্ধ, অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি, আদালতের সঙ্গে সংঘাত এবং বিভিন্ন পররাষ্ট্র ও প্রযুক্তিনীতি নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। তাঁর সমর্থকেরা এসব পদক্ষেপকে প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট ও বিভিন্ন নাগরিক ও গণমাধ্যম সংগঠন কয়েকটি পদক্ষেপের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ও মন্তব্যগুলো শুধু তাঁর প্রশাসনের নীতির অংশ হিসেবেই নয়, কংগ্রেস নির্বাচনকে ঘিরে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে এসব পদক্ষেপের নির্বাচনী প্রভাব কী হবে, তা নির্ধারণ করা এখনো সম্ভব নয়; জনমত ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগামী সপ্তাহগুলোতে পরিবর্তিত হতে পারে। তথ্যসূত্র: সিএনএন, রয়টার্স
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন