প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে, ২০২৮ সালের মধ্যে বেসরকারি খাত থেকে প্রায় ৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ইতোমধ্যে ১২টি স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের (আইপিপি) সঙ্গে মোট ৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এই প্রকল্পগুলোর জন্য প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ টাকা ১২ পয়সা।
বিপিডিবির একজন কর্মকর্তা জানান, নির্ধারিত এই বিদ্যুতের দাম পূর্বে চুক্তি করা একই ধরনের প্রকল্পগুলোর তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৫ সেন্ট কম।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে, সরকার ব্যাটারিসহ ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে উৎসাহিত করার জন্য একটি বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
এই প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায়, ব্যাটারিসহ ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ ব্যয় প্রতি ইউনিট ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ২০ শতাংশ মুনাফার হার এবং ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১ হাজার ৮৫২ দশমিক ০৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৭৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত এবং ৩৭৮ দশমিক ৫৬ মেগাওয়াট অফ-গ্রিড।
এছাড়া, বিপিডিবি নিজস্ব অর্থায়নে মোট ৬৮৯ মেগাওয়াট গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কনফিডেন্স পাওয়ার রংপুরের ভাইস চেয়ারম্যান ইমরান করিম জানান, তার প্রতিষ্ঠান ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার তিনটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘তিনটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পই ২০২৮ সালের মধ্যে চালু হবে।’
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিবদ্ধ ১২টি প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্পটি চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে নির্মাণ করা হবে। পাবনার ঈশ্বরদীতে ১৫০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
কক্সবাজারে ১০০ মেগাওয়াট করে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এছাড়া, বাগেরহাটের মোংলায় নির্মাণ করা হবে আরও একটি ১০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। ঈশ্বরদীতে ৭০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও স্থাপন করা হবে।
অবশিষ্ট প্রকল্পগুলো মৌলভীবাজারের বিবিয়ানা, নীলফামারীর জলঢাকা, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, মৌলভীবাজার সদর, চট্টগ্রামের হাটহাজারী এবং নোয়াখালীর সুধারামে স্থাপন করা হবে। এসব প্রকল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ১০ মেগাওয়াট থেকে ৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, আইপিপিগুলোর সঙ্গে করা এসব চুক্তি সরকারের বৃহত্তর জ্বালানি মিশ্রণ কৌশলের অংশ। এর লক্ষ্য হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং প্রচলিত, বিশেষ করে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো।
তিনি আরও জানান, বিপিডিবি রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করেছে। এছাড়া, অবকাঠামো বিনিয়োগ সহায়তা কোম্পানি (আইআইএফসি) ফেনীর সোনাগাজীতে ২২২ মেগাওয়াটের গ্রিড-সংযুক্ত সৌর ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিপিডির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিজস্ব অর্থায়নে ৬৮৮ কিলোওয়াট-পিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছে বিপিডিবি। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৪ হাজার ১৯৫ কিলোওয়াট-পিক সক্ষমতা চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
বিপিডি দুই বছর আগে নিজস্ব অর্থায়নে নিজেদের ভবন ও জমিতে ১৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল।
কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হাসান মেহেদী বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাংলাদেশকে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়তা করতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে, সরকার দেশের সব জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে আগামী তিন মাসের মধ্যে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বলেন, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা।
সরকারের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল ২০২৬-২০৩০-এর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া, বায়ু, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং অ্যাগ্রিভোলটাইক্সসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
হাসান মেহেদী বলেন, সরকার যদি সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে উৎসাহিত করতে পারে, তাহলে এ খাতে সরকারের বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন