প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দীর্ঘদিন থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালীকে ইরান তাদের নিজেদের সমুদ্র সীমা বলে দাবি করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল সেই দাবির বিপক্ষে গিয়ে সেখানে হস্তক্ষেপ করছে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে বিশ্বে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি করেছে। এখন আন্তর্জাতিক আইন বা সমুদ্র আইনেই দেখা যাক, সেটি আসলেই ইরানের দাবি কৃত নিজস্ব অঞ্চল কিনা?
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী কোন রাষ্ট্রের "আঞ্চলিক সমুদ্র সীমা"' তার সীমান্ত থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত,এবং উক্ত রাষ্ট্রের অধিকারের সীমা বা "সংলগ্ন অঞ্চল" ২৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। এমনকি ওই আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনেই ওই রাষ্ট্রের একচেটিয়া অঞ্চল ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। যদি একচেটিয়া অঞ্চল বাদ দেওয়াও হয় তবে আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা এবং সংলগ্ন অঞ্চলের সীমানা তো সর্বোচ্চ ২২ নটিক্যাল মাইল। ১ নটিক্যাল মাইল সমান ১.৮৫২ কিলোমিটার । আর ২৪ নটিক্যাল মাইল সমান ৪৪.৪৪৮ কিলোমিটার। আর হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অঞ্চল এর সর্বোচ্চ প্রস্থ সীমা ৩৩ কিলোমিটার। তাহলে এই জলপথ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী ইরানের এবং ইরান তার নিজস্ব সীমা এবং আঞ্চলিক সীমা হিসেবে সেটির আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী ন্যায্য অধিকারী। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরাইল কিংবা অন্য কোন রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং কোন রাষ্ট্রই অপরূপ কোন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অধিকার হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে না। অথচ হরমুজ প্রণালী নিয়ে যা হচ্ছে তা একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ সেই বিষয়টি নিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য থেকে গোটা বিশ্বে একটা যুদ্ধ পরিস্থিতির তৈরি করা হয়েছে এবং গোটা বিশ্বকে একটা বৃহৎ যুদ্ধের দিকে দিকে ঠেলে দিয়েছে ইজরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র।
হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের প্রস্থ প্রায় ৩৩ কিলোমিটার, অর্থাৎ মাত্র ১৮ নটিক্যাল মাইল। ফলে প্রণালীর এই অংশে ইরান ও ওমান—উভয় উপকূলীয় রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সমুদ্রসীমা পরস্পরের নিকটবর্তী। এ বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে বাইরের কোনো শক্তির একতরফা চাপ বা সামরিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক বলেই সমালোচকেরা মনে করেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি হলো প্রতিটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সীমান্ত এবং আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত অধিকারকে সম্মান করা। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, বিশ্বের কিছু পরাশক্তি নিজেদের কৌশলগত ও রাজনৈতিক স্বার্থকে আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে চায়। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক অবস্থান সেই প্রশ্নকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (UNCLOS) অনুযায়ী একটি উপকূলীয় রাষ্ট্রের সমুদ্রসীমা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত। উপকূলের ভিত্তিরেখা থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ২২.২২৪ কিলোমিটার পর্যন্ত আঞ্চলিক সমুদ্র, যেখানে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র পূর্ণ সার্বভৌম অধিকার ভোগ করে। এর পরবর্তী ২৪ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ৪৪.৪৪৮ কিলোমিটার পর্যন্ত সংলগ্ন অঞ্চল, যেখানে রাষ্ট্র নির্দিষ্ট আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রাখে। এছাড়া ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বিশেষ ক্ষেত্রে ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের অধিকারও আন্তর্জাতিক আইনেই স্বীকৃত।
হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের প্রস্থ প্রায় ৩৩ কিলোমিটার, অর্থাৎ মাত্র ১৮ নটিক্যাল মাইল। ফলে প্রণালীর এই অংশে ইরান ও ওমান—উভয় উপকূলীয় রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সমুদ্রসীমা পরস্পরের নিকটবর্তী। এ বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে বাইরের কোনো শক্তির একতরফা চাপ বা সামরিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক বলেই সমালোচকেরা মনে করেন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক উত্তেজনা কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও গভীর ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সংঘাত বৃদ্ধি পেলে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।
যুদ্ধ কখনোই স্থায়ী সমাধান এনে দেয় না। সামরিক শক্তির প্রদর্শন, হুমকি কিংবা সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার ওপরই সবচেয়ে বড় আঘাত হানে। তাই হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সমাধান অনুসন্ধানই হওয়া উচিত সকল পক্ষের অগ্রাধিকার।
প্রত্যেক রাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ড, সমুদ্রসীমা এবং আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত সার্বভৌম অধিকার রয়েছে। সেই অধিকারকে সম্মান করা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা রক্ষার মৌলিক শর্ত। কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধিক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় শক্তি প্রদর্শন কিংবা প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা বিশ্বব্যবস্থাকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
আজ বিশ্বের প্রয়োজন নতুন কোনো যুদ্ধ নয়; প্রয়োজন আন্তর্জাতিক আইনকে সমানভাবে প্রয়োগ করা, প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদাকে সম্মান করা এবং সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। অন্যথায় হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনা কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জনগণের জীবনযাত্রায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন