প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মহাবিশ্বের শক্তিশালী শক্তি-বিস্ফোরণের রহস্য অনুসন্ধানে দুই দশক কাটানোর পর, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার সুইফট টেলিস্কোপ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) মার্কিন মহাকাশ বাহিনী নিশ্চিত করে যে, এটি ইন্দোনেশিয়ার উত্তর সুমাত্রা প্রদেশের ওপর দিয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছে।
এই মহাকাশ পর্যবেক্ষণযন্ত্রটির ওজন ছিল প্রায় ১ হাজার ৪৫২ কেজি। এর পতন ঘটে, যখন এটি কক্ষপথে টিকিয়ে রাখার একটি উদ্ধার অভিযান ব্যর্থ হয়, যা প্রায় তিন মাস আগে শুরু হয়েছিল। নাসার তথ্য অনুযায়ী, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় এটি শব্দের গতির প্রায় ২২ গুণ গতিতে চলছিল।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্কিন মহাকাশ বাহিনী জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় বুধবার সকাল ৭টা ৩৯ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা ৩৯ মিনিট) সুইফট পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। ঘটনাটি ঘটে বিষুবরেখা থেকে প্রায় ৩২২ কিলোমিটার উত্তরে ইন্দোনেশিয়ার উত্তর সুমাত্রা অঞ্চলের আকাশে।
নাসার ধারণা ছিল, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় স্যাটেলাইটটির অধিকাংশ অংশ বায়ুর সঙ্গে ঘর্ষণজনিত তীব্র তাপে পুড়ে যাবে। তবে কিছু ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে। এখন পর্যন্ত এসব ধ্বংসাবশেষের কারণে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
নর্থ সুমাত্রা প্রদেশের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর মেদান থেকে স্যাটেলাইটটির পতনস্থলের দূরত্ব তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। শহরটিতে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে, এবং পুরো প্রদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ। তবে মার্কিন মহাকাশ বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষের কারণে পৃথিবীর কোনো মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। সংস্থাটি জানিয়েছে, এ ধরনের দুর্ঘটনায় কারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২ হাজার ১০০ জনে একজন।
ব্রিটিশ মহাকাশ প্রকৌশলী ডিন স্লেডেন রয়টার্সকে বলেন, স্যাটেলাইটটির মাত্র কয়েকটি ছোট ও পুড়ে যাওয়া টুকরা পৃথিবীর মাটিতে পৌঁছাতে পারে। তিনি জানান, সেগুলোর কোনোটি থেকেই টেলিস্কোপটির আসল চেহারা চেনার সুযোগ থাকবে না। তাঁর মতে, এ ধরনের আকারের স্যাটেলাইট নিয়মিতই বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। মহাকাশ অভিযানের ৭০ বছরের ইতিহাসে মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ পড়ে কোনো মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
নাসার এই সুইফট স্যাটেলাইটটি প্রায় ৫০ কোটি ডলার ব্যয়ে তৈরি হয়েছিল, যার মূল কাজ ছিল গামা-রে বিস্ফোরণ পর্যবেক্ষণ করা। মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরণগুলোর মধ্যে এসব বিস্ফোরণ অন্যতম। তিনটি টেলিস্কোপের সমন্বয়ে তৈরি এই পর্যবেক্ষণযন্ত্র বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে মহাজাগতিক ঘটনা অনুসন্ধান করত।
২০০৪ সালে উৎক্ষেপণের পর থেকে সুইফট শত শত সুপারনোভার বিস্ফোরণ, কৃষ্ণগহ্বরের নক্ষত্র ছিন্নভিন্ন করার ঘটনা, নক্ষত্রের এক্স-রে বিকিরণ, গ্রহাণু ও ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ করেছে। এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রায় ৭ হাজার বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এটি মাত্র দুই বছরের জন্য নকশা করা হয়েছিল, তবে এটি দুই দশকের বেশি সময় ধরে কার্যকর ছিল। গত ২০ অক্টোবর এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
নিজস্ব চালিকাশক্তি বা প্রপালশন ব্যবস্থা না থাকায়, সুইফটের কক্ষপথ কয়েক মাস ধরে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছিল। স্যাটেলাইটটির কার্যকাল বাড়ানোর চেষ্টা হিসেবে, গত জুলাইয়ে নাসা ও যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাভিত্তিক মহাকাশ স্টার্টআপ ক্যাটালিস্ট একটি বিশেষ উদ্ধারযান উৎক্ষেপণ করে। ‘লিংক’ নামের ওই মহাকাশযানের পরিকল্পনা ছিল সুইফটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেটিকে টেনে আরও উঁচু ও স্থিতিশীল কক্ষপথে নিয়ে যাওয়া।
কিন্তু মহাকাশে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই লিংক নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ঘুরতে শুরু করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে, আগস্টের মাঝামাঝি উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এরপর সুইফটকে পৃথিবীতে ফিরে আসতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সুইফটের পতনের মধ্য দিয়ে নাসার অন্যতম সফল মহাকাশ পর্যবেক্ষণ অভিযানের সমাপ্তি ঘটল।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন