প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
"নদী, জীবন ও জীবিকার অধিকার, মানুষের কণ্ঠে টেকসই আগামীর অঙ্গীকার" এই মূল প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাজশাহীর বারনই নদীপাড়ে "নদীপাড়ের মানুষের মুখে নদী কথা: জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা এবং করণীয়" শীর্ষক একটি কমিউনিটি নীতি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় নওহাটা বাজারসংলগ্ন বারনই নদীপাড়ে নওহাটা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি, বারসিক, গ্রিন কোয়ালিশন ও বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম যৌথভাবে এই সংলাপের আয়োজন করে। সংলাপের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নদীপাড়ের মানুষের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞানকে ভিত্তি করে নদী ব্যবস্থাপনায় নীতিগত অগ্রাধিকার, নির্দিষ্ট দাবি এবং বাস্তবায়নযোগ্য করণীয় নির্ধারণ করা।
কমিউনিটি নদী সংলাপের মাধ্যমে নদীর অধিকার ও নদীনির্ভর মানুষের অধিকারকে একই কাঠামোয় আনার পাশাপাশি স্থানীয় নারী ও জনগণের অংশগ্রহণকে প্রাতিষ্ঠানিক করার আহ্বান জানানো হয়। নদী রক্ষায় প্রকল্পকেন্দ্রিকতার পরিবর্তে সমন্বিত নদী শাসনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। নওহাটা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি সচীন হালদারের সভাপতিত্বে বক্তারা বলেন, "নদী বাংলাদেশের পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম ভিত্তি। নদীর পরিবর্তন শুধু পানি বা নাব্যতার পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে মানুষের পেশা, আয়, খাদ্য, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সরাসরি যুক্ত। নদীপাড়ের মানুষ নদীর প্রবাহ, মাছ, নৌচলাচল, পানি, নদীতীর, জলাভূমি ও জীবিকার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তাই বৈজ্ঞানিক তথ্যের পাশাপাশি তাদের অভিজ্ঞতা, অধিকার ও প্রত্যাশাকে নদী নীতির অংশ করা জরুরি।"
নদীপাড়ের চিত্তরঞ্জন হালদার বলেন, "এই পানি দিয়ে আগে আমরা ভাত, ডাল রান্না করে খেয়েছি।" তিনি তার হাতের ঘা দেখিয়ে বলেন, "এখন এই পানি গায়ে লাগলেই চুলকানি শুরু হয়ে যায় এবং ঘা হয়ে যায়।" নুজু হালদার বলেন, "প্রতিবছর আশ্বিন-কার্তিক মাসে শহরের দূষিত পানি নদীতে ছাড়া হয় আর তখনই নদীর মাছ মরে ভেসে উঠে। এবছরও এখানে পানি ছাড়ার পর বারনই নদীতে মাছ মরা শুরু হয়েছিল।"
পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, "নদীকে শুধু পানি প্রবাহের পথ হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত প্রতিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের নদীগুলোর জন্য সমন্বিত নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচি গ্রহণ এবং নদী ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। নদীর ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে নদীর তীরে বসবাসকারী মানুষের অভিজ্ঞতা, বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ভিত্তিতে।"
নৃবিজ্ঞানী ও পরিবেশ আইন গবেষক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, "নদী ব্যবস্থাপনায় নদীনির্ভর মানুষের স্থানীয় জ্ঞান ও প্রথাগত অধিকারকে স্বীকৃতি না দিলে কার্যকর নদী শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। নদী দখল, দূষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও নীতির কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি তথ্যের স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।"
সামাজিক ও কৃষক আন্দোলনের নেতা মাহমুদ জামাল কাদেরী বলেন, "নদী রক্ষায় বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, নদীর প্রবাহ, জলাভূমি, প্রাণবৈচিত্র্য ও নদীনির্ভর মানুষের অধিকারকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রয়োজন। নদী রক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিদ্যমান আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকলেও মূল প্রয়োজন হলো সমন্বিত বাস্তবায়ন। নদী সুরক্ষাকে জনঅংশগ্রহণ, জীবিকা সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সমন্বিত বিষয় হিসেবে দেখতে হবে।"
গ্রিন কোয়ালিশন, পবা উপজেলার সভাপতি রহিমা খাতুন বলেন, "নদীর সংকট শুধু নদীর পাড়ের মানুষের সমস্যা নয়; এর প্রভাব কৃষি, খাদ্য, আয় ও স্থানীয় জীবনের ওপর পড়ে। নদী রক্ষার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী, কৃষক, মৎস্যজীবী ও তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণকে শুধু নদী রক্ষার কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী নয়, নদী ব্যবস্থাপনার অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।"
সংলাপ থেকে ১০ দফা নীতিগত দাবি উপস্থাপন করা হয়। সংলাপে বারনই নদী ও সংযুক্ত জলপ্রবাহের পাশাপাশি পদ্মা/গঙ্গাসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের নদীগুলোর জন্য ১০ দফা নীতিগত দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো- বারনই ও সংযুক্ত নদীগুলোর সমন্বিত মানচিত্র তৈরি করতে হবে; নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও সংযোগ সুরক্ষায় বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করতে হবে; দূষণের উৎস চিহ্নিত করে উৎসেই দূষণ বন্ধ করতে হবে; নদী ও তীরের অবৈধ দখল শনাক্ত করে সময়বদ্ধ ব্যবস্থা নিতে হবে; নদী পুনরুদ্ধারকে শুধু খনন নয়, পূর্ণাঙ্গ ইকোলজিকাল রিস্টোরেশন হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে; নদী প্রকল্পের আগে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে; নদীনির্ভর মানুষের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে; স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণকে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণের অংশ করতে হবে; বারনই ও সংযুক্ত নদীগুলোর জন্য কমিউনিটি নদী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে; নদী-সংক্রান্ত তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে; সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে; নিয়মিত কমিউনিটি নদী সংলাপ/গণশুনানীর ও সময়বদ্ধ নদী কর্মপরিকল্পনা এর মাধ্যমে অগ্রগতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন