প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এয়ারসাইডে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে এবং অ্যাপ্রোন এলাকায় অবাধে চলাচল করছে শত শত যানবাহন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে এসব যানবাহনের কোনো ট্র্যাকিং নেই।
এমন অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচলে বিমানবন্দরের যাত্রী নিরাপত্তায় গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবুও বাধ্যতামূলক ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) স্থাপনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এয়ারলাইন্সগুলো বেবিচকের নির্দেশনা ও আলটিমেটামকে আমলে না নেওয়ায় সংকট আরও বাড়ছে। থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধনে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটির সভায়ও বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানা যায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, এয়ারসাইডে নজরদারির বাইরে এসব যান চলাচলে যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। উড়োজাহাজের নিরাপদ চলাচল ও যাত্রীদের জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, এয়ারসাইড এলাকায় যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন যান কোথায় যাচ্ছে, কত গতিতে চলছে এবং অনুমোদিত এলাকায় রয়েছে কি না- এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা জরুরি। রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় একটি যানবাহনের ভুল চলাচল বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। বেবিচকের নির্দেশনা বাস্তবায়নে এয়ারলাইন্সগুলোর গড়িমসি নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। দ্রুত সব যানবাহনকে কেন্দ্রীয় নজরদারির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত তদারকি ও নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বেবিচক সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম যুগান্তরকে বলেন, ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) স্থাপনের জন্য এয়ারলাইন্সগুলোকে অনেকবার সময় দেওয়া হয়েছে। একাধিকবার তাগাদাও দেওয়া হয়েছে। এবার আর ছাড় দেওয়া হবে না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভিটিএস যুক্ত না করলে যানবাহন প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। তিনি জানান, বিশ্বের আধুনিক বিমানবন্দরগুলোয় এ ধরনের প্রযুক্তি বহু বছর ধরেই ব্যবহার হচ্ছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভিটিএস চালু হলে এয়ারসাইড এলাকায় চলাচলকারী সব অনুমোদিত যানবাহনকে কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে ভিটিএস না থাকায় যেসব গাড়ি এয়ারসাইডে চলাচল করছে, সেগুলোর গতিবিধি কার্যকরভাবে মনিটরিং করা যাচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, কোন এয়ারলাইন্স কতটি গাড়িতে ভিটিএস স্থাপন করেছে এবং কতটি বাকি রয়েছে, কোম্পানিগুলোর কাছে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। তথ্য পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার, এয়ার এস্ট্রা, স্কাই ক্যাপিটাল এয়ারলাইন্সসহ বিমানবন্দরে অপারেশন পরিচালনাকারী বিভিন্ন দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্স ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার প্রধানদের বারবার নির্দেশনা দিলেও সেটি তারা মানছে না।
জানা যায়, অ্যাপ্রোন এলাকায় উড়োজাহাজ ও অন্যান্য যানবাহনের গতিবিধি নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ এবং দুর্ঘটনা এড়াতে সদ্য স্থাপিত সিএনএস-এটিএম ও এ-এসএমজিসিএস প্রযুক্তির আওতায় ভিটিএস স্থাপন বাধ্যতামূলক করে বেবিচক। চলতি বছরের ১৫ জুনের মধ্যে সব যানবাহনে ভিটিএস বসিয়ে তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও তারা গড়িমসি করে। পরে সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বারবার নির্ধারিত সময় পার হলেও এয়ারলাইন্সসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেনি। বরং প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতেই অনীহা দেখাচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বেবিচকের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে ২৬ অক্টোবর আরেকটি ‘অতিব জরুরি’ চিঠি ইস্যু করা হয়।
যুগান্তরের হাতে আসা সেই চিঠির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পরিচালক মো. শামসুল হকের সই করা জরুরি চিঠিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ২৭ অক্টোবরের (মঙ্গলবার) মধ্যে শতভাগ গাড়িতে ভিটিএস সংযোজন সম্পন্ন করে তালিকা জমা দিতে হবে। সেই সময়সীমাও শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো উড়োজাহাজ কোম্পানি ভিটিএসযুক্ত তাদের যানবাহনের তালিকা দেয়নি। এমন বাস্তবতায় ৭ ডিসেম্বরের পর ভিটিএস ছাড়া কোনো যানবাহন এয়ারসাইডে চলাচলের অনুমতি পাবে না বলে থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধনসংক্রান্ত স্টিয়ারিং কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। এবার নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ভিটিএস স্থাপন না করলে এয়ারসাইডে যানবাহন চলাচলজনিত কোনো দুর্ঘটনা বা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে এর একক দায়ভার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হবে।
বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ট্র্যাকার স্থাপন করা হলে রাডারব্যবস্থার মাধ্যমে পৃথকভাবে প্রতিটি যানবাহনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যাবে। কোনো গাড়ি বিপজ্জনক এলাকায় অবস্থান করলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক করা সম্ভব হবে। এতে আধুনিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা যাবে এবং বিমান ওঠানামার নিরাপত্তা আরও জোরালো হবে। কিন্তু এয়ারলাইন্সগুলো নিজেরাই নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও ভিটিএস স্থাপন না করার বিষয়ে জানতে চাইলে এয়ার অ্যাস্ট্রার হেড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড এয়ারলাইন সিকিউরিটি গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) এবিএম সারওয়ার জামান যুগান্তরকে বলেন, ভিটিএস বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এ কারণে কিছুটা সময় লাগছে। আশা করছি, তৃতীয় টার্মিনাল চালুর আগেই আমরা ভিটিএস স্থাপন করতে পারব। অপরদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বলছে, কার্যক্রম চলমান। খুব শিগ্গিরই তারা তালিকা বেবিচকে জমা দিয়ে দেবে।
অতীতেও ঘটেছে একাধিক দুর্ঘটনা : ভিটিএস না থাকায় অতীতে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটে। গত বছরের নভেম্বরে শাহজালালে একটি পুশকার্টের ধাক্কায় এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং উড়োজাহাজের নোজ হুইল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ফ্লাইটটি বাতিল করতে হয়। এর আগে ২০২২ সালে বিমানের হ্যাঙ্গারে একটি বোয়িং-৭৩৭ বের করার সময় অবস্থানরত আরেকটি বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজকে ধাক্কা দেয়। একই বছর ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ট্রলি বিমানের একটি উড়োজাহাজে আঘাত হানে। প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং না থাকায় এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে, বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রযুক্তি তৈরি, কিন্তু প্রয়োগ নেই : বেবিচক সূত্র জানায়, শাহজালাল বিমানবন্দরে অ্যাডভান্সড সারফেস মুভমেন্ট গাইডেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (এএসএমজিসিএস) এবং ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। কন্ট্রোল টাওয়ারে প্রতিটি গাড়ির গতি, অবস্থান ও রুট রিয়েল-টাইমে দৃশ্যমান করার সব ব্যবস্থা আছে। কিন্তু উড়োজাহাজগুলোর গ্রাউন্ড সাপোর্ট যান, ক্যাটারিং ও কার্গো ভ্যানগুলোয় পৃথক ট্র্যাকার না বসানোয় এ প্রযুক্তির পূর্ণ সুবিধা নেওয়া যাচ্ছে না। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারে কর্মরত নিয়ন্ত্রকরা রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রোন ও সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত কিংবা চলাচলরত বিমান ও অন্যান্য যান্ত্রিক যান শনাক্ত করতে পারে। যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে প্রয়োজনীয় শনাক্তকরণ প্রযুক্তি নির্মাণের সময় থেকেই সংযোজিত থাকে। তবে গাড়ি, বাস বা অন্য সেবা যান শনাক্ত করতে সেগুলোর গায়ে বিশেষ ভেহিকেল ট্র্যাকার স্থাপন করতে হয়। ইতোমধ্যে শতাধিক ভেহিকেল ট্র্যাকার ও সংশ্লিষ্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন বিমানবন্দরের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন