প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে সরকারি উদ্যোগে ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে হতদরিদ্র, ভূমিহীন, দিনমজুর ও অকৃষকদের নাম কৃষকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে তাদের নামে সরকারি গুদামে ধান সরবরাহের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এতে প্রকৃত কৃষকেরা সরকারি মূল্যে ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে নাগেশ্বরী উপজেলায় প্রায় ৮ কোটি ৭২ লাখ ২৮ হাজার টাকা মূল্যের ২ হাজার ৪২৩ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। নির্ধারিত মূল্যে ৮০৭ জন কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের কথা রয়েছে। এ জন্য অনলাইনে আবেদন নেওয়ার পর লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, আবেদন প্রক্রিয়ায় একটি চক্র প্রকৃত কৃষকদের পরিবর্তে বিভিন্ন সরকারি সুবিধা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র ও ভূমিহীন মানুষের তথ্য ব্যবহার করে আবেদন করে। পরে লটারিতে তাঁদের নাম উঠে আসার পর ওই ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব খুলিয়ে তাঁদের নামে ধান সরবরাহ ও অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে উপজেলার কচাকাটা ইউনিয়নের একছাটবাড়ী এলাকায় এমন বেশ কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যাঁদের নিজেদের কোনো আবাদি জমি নেই। তাঁদের কেউ দিনমজুর, কেউ বিধবা বা হতদরিদ্র। অথচ সরকারি নথিতে তাঁরা কৃষক হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় একটি চক্র সরকারি বিভিন্ন সুবিধা যেমন কৃষি কার্ড, বিধবা ভাতা বা অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার কথা বলে এসব মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি সংগ্রহ করে ব্যাংক হিসাব খুলতে সহায়তা করে। পরবর্তীতে তাঁদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া চেকের পাতা ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। বিনিময়ে কাউকে এক হাজার, কাউকে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে বলে কয়েকজন অভিযোগকারী জানিয়েছেন।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য, তাঁরা সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতেন না। তাঁদের নাম ব্যবহার করে কীভাবে ধান দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের নামে কত টাকা লেনদেন হয়েছে এসব বিষয়ও তাঁরা জানেন না।
কচাকাটা এলাকার এক দরিদ্র নারী জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। নিজের বসতভিটার বাইরে কোনো আবাদি জমি নেই। বিধবা ভাতা দেওয়ার কথা বলে তাঁকে ব্যাংকে নেওয়া হয় এবং সেখানে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে তাঁর নামে থাকা চেক ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমানের অভিযোগ, তিনি প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদন করলেও সরকারি খাদ্যগুদামে ধান দেওয়ার সুযোগ পাননি। তাঁর দাবি, প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে অকৃষকদের নাম ব্যবহার করে একটি চক্র সরকারি ধান সংগ্রহের সুবিধা নিচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয়ভাবে নাম আসা দুলাল মিয়া বলেন, শুধু কচাকাটা নয়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকেরাই গুদামে ধান না দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে ধান বিক্রি করেন। তবে তিনি কোনো আর্থিক সুবিধা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নির্দেশেই তিনি এসব কাজে যুক্ত ছিলেন।
এ বিষয়ে নাগেশ্বরী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাউছার হাবিব অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, কৃষি বিভাগের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে আবেদনকারীদের প্রত্যেককে যাচাই করা কঠিন। তবে কৃষক নন এমন কারও নাম তালিকায় থাকলে তিনি ধান দিতে পারবেন না। প্রয়োজন হলে এসব নাম বাদ দিয়ে পুনরায় লটারি করার বিধান রয়েছে। খাদ্য বিভাগ কার কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করছে, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় হয়নি বলেও তিনি জানান।
এদিকে স্থানীয় প্রকৃত কৃষকদের দাবি, সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তালিকাভুক্ত কৃষকদের মাঠপর্যায়ে যাচাই, জমির তথ্য পরীক্ষা এবং যাঁদের নামে ধান সরবরাহ দেখানো হয়েছে তাঁদের কাছ থেকে প্রকৃতপক্ষে ধান নেওয়া হয়েছে কি না তা তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনিয়ম প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন