প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বোরো ধান ঘরে তোলার পর আমন চাষ শুরু হওয়ার পূর্ববর্তী সময়কাল পর্যন্ত রংপুরের কৃষিতে স্থবিরতা বিরাজ করত। জমির একটি বড় অংশ অনাবাদি থাকত। কৃষিশ্রমিকদের জন্য কাজের অভাব দেখা দিত। অনেক পরিবারকে অভাব-অনটনের সময় পার করতে হতো। এই পরিস্থিতির সঙ্গে ‘মঙ্গা’ শব্দটি গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল।
বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়টিও আর সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকছে না। আউশসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের আবাদে জমি উৎপাদনের আওতায় আসছে, ফলে কৃষিকাজের সুযোগও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলার কৃষিতে আউশ এখন বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়কে কাজে লাগানোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল হয়ে উঠেছে। কৃষকদের আগ্রহ ও চাষের বিস্তারে গত কয়েক বছরে এ অঞ্চলে আউশের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ অঞ্চলে আউশের আবাদ হয়েছিল ২৪ হাজার ৯৮৮ হেক্টর জমিতে। ওই বছর হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ২ দশমিক ৯৮ মেট্রিক টন। মোট উৎপাদন হয়েছিল ৭৩ হাজার ৬৫৬ মেট্রিক টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আবাদ হয়েছিল ৪০ হাজার ৬১৮ হেক্টর জমিতে। প্রতি হেক্টর জমিতে ফলন ছিল ৩ দশমিক ০৪ মেট্রিক টন। ওই বছর উৎপাদন হয়েছিল এক লাখ ২৩ হাজার ৪৭৮ মেট্রিক টন।
২০১৯-২০ অর্থবছরে আবাদ হয়েছিল ৪৭ হাজার ৭৭৬ হেক্টর জমিতে। প্রতি হেক্টরে ফলন ছিল ৩ দশমিক ১৪ মেট্রিক টন। সেই অনুযায়ী ১ লাখ ৫০ হাজার ১৬ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে আবাদ হয়েছিল ৬০ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে। ওই বছর ৩ দশমিক ১০ মেট্রিক টন উৎপাদন হলেও মোট উৎপাদন ছিল এক লাখ ৮৬ হাজার ৮৬৮ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ সালে ৬২ হাজার ৯০ হেক্টর, ২০২২-২৩ সালে ৬৩ হাজার ৬৮০ হেক্টর এবং ২০২৩-২৪ সালে ৬১ হাজার ৭৮২ হেক্টর জমিতে আউশ চাষ হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬১ হাজার ১৫৭ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিল, উৎপাদন হয়েছিল এক লাখ ৮০ হাজার ২৬৮ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ১৬৩ হেক্টরে। একই সময় হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ০২ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরে মোট উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছে এক লাখ ৮৪ হাজার ৭১২ মেট্রিক টন।
অর্থাৎ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অঞ্চলে আউশের আবাদ প্রায় ৬০ হাজার হেক্টরের ওপরেই রয়েছে। গত ৯ বছরের ব্যবধানে আউশের আবাদ বেড়েছে ৩৬ হাজার ১৭৫ হেক্টর। আবাদ বৃদ্ধির পাশাপাশি ফলনেও এসেছে উল্লেখযোগ্য উন্নতি।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ব্রি-৪৮, ব্রি ৯৮, বিনা-২১, ধানী গোল্ড, গোল্ডেন-১, জনকরাজসহ অন্তত ৩০ ধরনের আউশ ধান চাষ হচ্ছে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায়।
সরেজমিন কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলে এক সময় ‘মঙ্গা’ শব্দটির সঙ্গে কাজের অভাব ও খাদ্যসংকটের দীর্ঘ ইতিহাস ছিল। বোরো ধান কাটার পর আমন চাষ শুরুর আগ পর্যন্ত কৃষিশ্রমিকদের হাতে কাজ কমে যেত। কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো তখন আয়-রোজগারের সংকটে পড়ত।
তবে, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। আউশসহ বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি ও মৌসুমি ফসলের আবাদ বাড়ায় বছরের বিভিন্ন সময়ে জমি চাষের আওতায় আসছে। ফলে কৃষকের পাশাপাশি কৃষিশ্রমিকদেরও কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
গংগাচড়ার কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমাদের এখানে ধুধু চর। কখনো শুকনো মৌসুম, কখনো পানিতে ডুবে থাকতে হয়। বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে কাজের সংকট ছিল। এখন আউশসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ বেড়েছে। ফলে ওই সময়টাতেও জমিতে কৃষিকাজ হচ্ছে, এখন সময়টা অনেক ভালো।’
আব্দুর রহিম আরও বলেন, কয়েক বছর আগেও কাজের অভাব ছিল, আমাদের মঙ্গা এলাকার লোক বলত। এখন মানুষের হাতে কাজ আসছে। কোনো সময়ই আমরা বসে থাকি না। আউশ অনেকটাই আমাদের ভাগ্য বদল করে দিয়েছে।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বড় বাড়িগ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, ‘বোরো কাটার পর জমি ফেলে না রেখে আউশ (বড় ধান) চাষ করা যায়। এতে একই জমি থেকে ফাও (বাড়তি) আরেকটা ফসল পাওয়া যায়। পরিশ্রম কম, খরচ কম। মোটামুটি লাভও হচ্ছে। এতে জমি ফেলে না রেখে আবাদ করায় মানুষের যে অভাব ছিল সেটা এখন আর নেই।’
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আউশ ধানের আবাদ বেড়েছে, কৃষক অনেক বেশি লাভবান না হলেও আগ্রহটা বেড়েছে। তারা জানান, এক একর জমিতে আউশ ধান উৎপাদনে বীজ, বীজতলা ও সার, চারা, সেচ, কিটনাশক মজুরি, মাড়াইসহ মোট খরচ প্রায় ৫২ হাজার ৫১২ টাকা। এক একরে ধানের উৎপাদন ধরা হয়েছে প্রায় এক হাজার ৫৩০ কেজি। খড়ের মূল্য বাদ দিলে ধানের নিট উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ হাজার ৯১২ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৯ টাকা।
কৃষক পর্যায়ে প্রতিকেজি ধান ৩৪ টাকা দরে বিক্রি হলে একরপ্রতি মুনাফা থাকে প্রায় চার হাজার ৭০০ টাকা।
কৃষকরা জানান, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। আবার ধান কাটার মৌসুমে বাজারদর কমে গেলে লাভ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ধানের দাম ভালো থাকলে কৃষক এই ধান চাষে আরো আগ্রহী হয়ে উঠবে।
কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, আউশের আবাদ আরো বাড়াতে হলে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি উপকরণে ভর্তুকি বা প্রণোদনা, মানসম্মত বীজ ও সার সহজলভ্য করা এবং বাজারে ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে আউশ চাষে কৃষকের আগ্রহ আরো বাড়বে। এতে এক সময়ের মঙ্গা যেভাবে দূর হয়েছে, ঠিক একইভাবে আরো আর্থিক সচ্ছলতা বাড়বে এই অঞ্চলের কৃষকদের।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, রংপুর অঞ্চলের কৃষিতে বড় পরিবর্তনের একটি দিক হলো বছরের মাঝের সময়টুকুও এখন আর আগের মতো পুরোপুরি অনাবাদি থাকছে না। আউশসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল সেই সময়টাকে উৎপাদনের মধ্যে নিয়ে এসেছে। ফলে জমির ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি কৃষিকাজের পরিধিও হয়েছে বিস্তৃত।
অতিরিক্ত পরিচালক বলেন, আউশ স্বল্পমেয়াদি ফসল হওয়ায় বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে এই ধান চাষ হয়। উন্নত জাত নির্বাচন, সময়মতো চাষ, সুষম সার প্রয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফলন আরো বাড়াতে কৃষকদের সাবির্ক সহযোগিতা করা হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন