প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফুটবলে গোল করার মাধ্যমে একজন খেলোয়াড় নায়ক হয়ে ওঠেন, আর গোল হজম হলে গোলকিপার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যান। একটি অবিশ্বাস্য সেভ দলকে জয় এনে দিতে পারে, আবার গোলকিপারের বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত প্রতিপক্ষের আক্রমণকে নস্যাৎ করতে পারে। তবুও, ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অরে গোলকিপারদের সাফল্য অত্যন্ত সীমিত।
১৯৬৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কিংবদন্তি লেভ ইয়াশিনের পর থেকে আর কোনো গোলকিপার এই পুরস্কার জিততে পারেননি। এর পেছনে রয়েছে পারফরম্যান্স মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা, দর্শকদের গোলের প্রতি আকর্ষণ এবং গোলকিপারদের অবদান পরিমাপের জটিলতা।
১৯৬৩ সালে ব্যালন ডি’অর জিতে ইতিহাস গড়েন লেভ ইয়াশিন। তিনি ফুটবল ইতিহাসে একমাত্র গোলকিপার, যিনি পুরুষদের ব্যালন ডি’অর অর্জন করেছেন। ছয় দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আর কোনো গোলকিপার তাঁর কীর্তির পুনরাবৃত্তি করতে পারেননি।
কিছু কিংবদন্তি কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। ১৯৭৩ সালে ইতালির দিনো জফ ব্যালন ডি’অরে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ২০০২ সালে জার্মানির অলিভার কান তৃতীয় হন। ২০০৬ সালে ইতালির বিশ্বকাপজয়ী দলের গোলকিপার জিয়ানলুইজি বুফন দ্বিতীয় হন। ২০১৪ সালে জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী দলের ম্যানুয়েল নয়্যারও ব্যালন ডি’অরে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।
এই তালিকাই প্রমাণ করে, গোলকিপারদের পারফরম্যান্স বিশ্বসেরার স্বীকৃতি পাওয়ার মতো হলেও চূড়ান্ত পুরস্কারটি তাদের অধরাই থেকে গেছে।
২০০২ বিশ্বকাপ ছিল অলিভার কানের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অধ্যায়। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে গোল্ডেন বল জিতেন জার্মান অধিনায়ক। বিশ্বকাপে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারজয়ী একমাত্র গোলকিপারও তিনিই।
তবে ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে রিভালদোর শট তিনি ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। ফিরতি বলে গোল করেন রোনালদো। সেই ভুলই যেন আড়াল করে দেয় টুর্নামেন্টজুড়ে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্সের বড় অংশ।
কান শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালের ব্যালন ডি’অরে তৃতীয় হন। ফাইনালের ফল অন্য রকম হলে তাঁর ব্যক্তিগত স্বীকৃতির হিসাবও ভিন্ন হতে পারত। তবে এমন সম্ভাবনা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বরং ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, গোলকিপারের একটি ভুল কীভাবে দীর্ঘ সময়ের ভালো পারফরম্যান্সকে ছাপিয়ে যেতে পারে।
আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের অবদান পরিমাপের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো গোল ও অ্যাসিস্ট। একটি গোল কিংবা শেষ মুহূর্তের জয়সূচক শট মুহূর্তেই একজন ফুটবলারকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
কিন্তু গোলকিপারের কাজ শুধু শট ঠেকানো নয়। কখন সামনে এগিয়ে আসতে হবে, কীভাবে নিজের অবস্থান ঠিক রাখতে হবে, কখন বল বিপদমুক্ত করতে হবে এবং রক্ষণভাগের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ রাখতে হবে এসব সিদ্ধান্তও ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আধুনিক ফুটবলে প্রত্যাশিত গোল বা এক্সপেক্টেড গোলের পাশাপাশি শট-পরবর্তী প্রত্যাশিত গোলের মতো পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হয়। এসব বিশ্লেষণের মাধ্যমে গোলকিপারের সেভের কার্যকারিতা ও কঠিন শট ঠেকানোর সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
তবে সব অবদান পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। প্রতিপক্ষের থ্রু পাস আগেই বুঝে বলের কাছে পৌঁছে যাওয়া কিংবা বিপজ্জনক আক্রমণ শুরু হওয়ার আগেই সঠিক অবস্থান নেওয়ার কারণে কোনো সেভ নাও করতে হতে পারে। তবুও সেই সিদ্ধান্ত প্রতিপক্ষের গোলের সুযোগ নষ্ট করে দিতে পারে।
এ ধরনের অবদান দর্শকের চোখে সব সময় পড়ে না। গোল বা অ্যাসিস্টের মতো সহজে সংখ্যায় প্রকাশ করাও কঠিন।
গোলকিপারের প্রভাব শুধু গোলপোস্টের সামনে সীমাবদ্ধ নয়। একজন নির্ভরযোগ্য গোলকিপার পুরো রক্ষণভাগকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারেন। ডিফেন্ডাররা জানেন, তাদের পেছনে একজন দক্ষ খেলোয়াড় আছেন, যিনি বিপদ সামাল দিতে পারবেন। ফলে তাঁরা আরও আগ্রাসীভাবে খেলতে পারেন।
একইভাবে, গোলকিপার নিয়মিত কঠিন শট ঠেকাতে পারলে দলের অন্য খেলোয়াড়দের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস বাড়ে। প্রতিপক্ষ একের পর এক সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে ব্যর্থ হলে তাদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে।
নটিংহাম ফরেস্টের সাবেক গোলকিপার পিটার শিলটনের গুরুত্ব বুঝেছিলেন কিংবদন্তি কোচ ব্রায়ান ক্লফ। ভালো গোলকিপার একটি মৌসুমে দলকে ১৫ থেকে ২০ পয়েন্ট পর্যন্ত এনে দিতে পারেন এমন ধারণার মাধ্যমে গোলকিপারের প্রভাব বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এটি সর্বজনস্বীকৃত কোনো পরিসংখ্যানগত নিয়ম নয়; বরং একজন গোলকিপার কীভাবে পুরো দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারেন, তার একটি ব্যাখ্যা।
একজন ফরোয়ার্ড ম্যাচের অধিকাংশ সময় নিষ্প্রভ থেকেও শেষ মুহূর্তে গোল করে নায়ক হয়ে উঠতে পারেন। বিপরীতে, একজন গোলকিপার ৮৯ মিনিট অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখানোর পরও শেষ মুহূর্তে একটি ভুল করলে সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন।
এর কারণ, গোলকিপারের ভুলের ফল প্রায়ই সরাসরি স্কোরলাইনে দেখা যায়। একটি ভুলে গোল হজম হতে পারে, হারতে পারে দল। অথচ একই ম্যাচে তার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভের মূল্যায়ন তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
ব্যালন ডি’অরের মতো পুরস্কারে খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি আলোচনায় থাকা, স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করা এবং মৌসুমজুড়ে প্রভাব বিস্তার করাও গুরুত্বপূর্ণ। গোলকিপারদের অবদান যেহেতু অনেক সময় প্রতিরোধমূলক ও অদৃশ্য, তাই তাঁদের পক্ষে এমন স্বীকৃতি পাওয়া তুলনামূলক কঠিন হয়ে পড়ে।
গোলকিপারদের পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি দিতে ২০১৯ সাল থেকে চালু হয়েছে ইয়াশিন ট্রফি। কিংবদন্তি লেভ ইয়াশিনের নামে দেওয়া এই পুরস্কার গোলকিপারদের জন্য আলাদা স্বীকৃতি নিশ্চিত করেছে।
তবে আলাদা পুরস্কার থাকলেও মূল ব্যালন ডি’অরের প্রতিযোগিতায় গোলকিপারদের পিছিয়ে পড়ার প্রশ্নটি থেকেই যায়। তাঁদের পারফরম্যান্সকে শুধু ক্লিন শিট বা গোলশূন্য ম্যাচের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। বরং কতগুলো কঠিন গোল ঠেকিয়েছেন, বিপজ্জনক পরিস্থিতি কীভাবে সামলেছেন, মাঠের কোন জায়গা নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং দলের খেলার ধরনে কতটা প্রভাব রেখেছেন এসব বিষয়ও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
ফুটবলে গোল করা যেমন দক্ষতার পরিচয়, গোল ঠেকানোও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। কিন্তু গোলের উচ্ছ্বাস যত সহজে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়, গোল ঠেকানোর অবদান ততটা আলোচনায় আসে না।
ব্যালন ডি’অরে গোলকিপারদের দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি তাই শুধু ব্যক্তিগত পুরস্কারের হিসাব নয়; বরং ফুটবলে পারফরম্যান্স মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন। গোলকিপারদের অবদানকে অন্য পজিশনের খেলোয়াড়দের সমান গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা না গেলে লেভ ইয়াশিনের পর আরেকজন গোলকিপারের হাতে ব্যালন ডি’অর ওঠার অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন