প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইরানের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ধসিয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মহাপরিকল্পনা ঘোষণার পরপরই মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক মারাত্মক ও রক্তক্ষয়ী পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানানোর হুমকি দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের বিপরীতে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ স্তব্ধ করা, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং প্রয়োজনে নিজস্ব পারমাণবিক নীতি সংশোধন করে পরমাণু বোমা তৈরির মতো চরম পথ বেছে নেওয়ার বার্তা দিয়েছে তেহরান।
গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ঘোষণা করেন যে, ইরানের ওপর বছরের পর বছর ধরে চাপিয়ে দেওয়া ব্যাপক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তেহরান যেসব জটিল ও গোপন কৌশলগত বাণিজ্য নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, তা এবার ধসিয়ে দেবে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে ছয় মাস ধরে চালানো যুদ্ধের পর কূটনৈতিক সমাধান ছাড়াই যখন সংঘাত স্থবির অবস্থায় পৌঁছেছে, ঠিক তখনই এই অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ঘোষণা এলো। বেসেন্ট যে গৌণ বা ‘সেকেন্ডারি’ স্যাংশনের কথা জানিয়েছেন, তাতে ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি ও শিপিংয়ের মতো যেসব খাতের ওপর ভিত্তি করে ইরানের অর্থনীতি টিকে আছে, সেসব খাতে ইরানি অংশীদারদের ওপর সরাসরি জরিমানা ও আইনি কঠোরতার কথা বলা হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের এই বহুল আলোচিত ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ কঠোরতম নতুন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে শেষ পর্যন্ত কিছুটা ধীরনীতি অবলম্বন করায় অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই কিছুটা হতাশ হয়েছেন। ওয়াশিংটন আপাতত নতুন কোনো বড় ধরনের বিধিনিষেধ না চাপিয়ে বরং বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞাসমূহকে আরও কড়াভাবে প্রয়োগের দিকেই জোর দিচ্ছে, তবে একই সঙ্গে যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করবে না, তাদের ভবিষ্যতে চরম মূল্য দিতে হবে বলেও চরম সতর্কবার্তা জারি রেখেছে।
তবে মার্কিন প্রশাসনের এমন প্রত্যক্ষ হুমকি সত্ত্বেও তেহরান দমে যাওয়া বা নতিস্বীকার করার পরিবর্তে ওয়াশিংটন ও তার সহযোগীদের সমপরিমাণ কিংবা তার চেয়ে বেশি আর্থিক ও সামরিক ক্ষতি সাধনের হুংকার দিচ্ছে। তেহরানের তরফ থেকে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, তারা আঞ্চলিক তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ আরও জোরদার করবে, ইউরোপীয় দেশগুলোকে যুদ্ধের আওতাভুক্ত করবে এবং শেষ অস্ত্র হিসেবে নিজেদের বন্ধ হয়ে থাকা পারমাণবিক কর্মসূচিকে পুনরায় অস্ত্রায়নের রূপ দেবে।
সোমবার রাজধানী তেহরানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কিছুটা ইঙ্গিতবহ ভাষায় বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবা খেলে অভ্যস্ত ছিলেন, কিন্তু এরই মাঝে তারা পোকার খেলাটাও শিখে গেছেন এবং ইদানীং তারা এই দুটি খেলার এক বিশেষ সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নিজেদের চাল চালছেন।
তেহরানের এই কৌশলগত অবস্থানের পর তেলবাজার স্তব্ধ হওয়ার এক বড় ধরনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টানা কয়েক মাস ধরে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে দিচ্ছে না ইরান, যার ফলে যুদ্ধের আগে পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মোট তেল ও গ্যাসের চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ যে জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো, তা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনে ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের তেল রফতানি ও মূল অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন এক যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলেছে। কিন্তু এখন ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক নীতিনির্ধারকরা বলছেন, তারা হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বিকল্প পথগুলোতেও তেল সরবরাহের ওপর হামলা চালাবেন।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অন্যতম শীর্ষ নেতা মহসিন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি কড়া পোস্ট দিয়ে লিখেছেন যে, যদি এই মার্কিন অর্থনৈতিক যুদ্ধ অব্যাহত থাকে, তবে হরমুজ প্রণালি তো দূর, পারস্য উপসাগরের অন্য কোনো অঞ্চল থেকেও আর একফোঁটা তেলও বিদেশে রফতানি হতে দেওয়া হবে না। পরবর্তীতে এক টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমেরিকা ও তার দোসরদের ওপর ইরান ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ উপায়ে পাল্টা আঘাত হানবে।
আমেরিকান নৌবাহিনীর সুরক্ষায় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল কোম্পানিগুলো অবশ্য ইরানি কর্তৃপক্ষের নজর এড়াতে তাদের তেলের ট্যাংকারগুলোর ট্র্যাকিং ও ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে সমুদ্রপথে কিছু পরিমাণ তেল সফলভাবে রফতানি করতে শুরু করেছে, তবে তা যুদ্ধপূর্ব পরিমাণের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। সৌদি আরব বর্তমানে তাদের নিজস্ব ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল ঘুরিয়ে লোহিত সাগর দিয়ে রফতানি করছে, অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল উৎপাদনকারীরা হরমুজ এড়িয়ে দিনে আরও ২০ লাখ ব্যারেল তেল অন্য পথে বিশ্ববাজারে পাঠাচ্ছে।
তবে তেহরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, এসব বিকল্প রুটও তাদের রাডারের আওতায় রয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই ৪৫টি জাহাজের একটি নির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করেছে, যাদের বিরুদ্ধে হরমুজ প্রণালির জলসীমায় তাদের আরোপিত বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান সতর্ক করে দিয়েছে যে, যেসব জাহাজ তাদের প্রটোকল অমান্য করবে, সেগুলোকে ভবিষ্যতে প্রবেশের ক্ষেত্রে জরিমানা, আটক বা সরাসরি বাজেয়াপ্তের মুখোমুখি হতে হবে।
এদিকে তেহরান শুধু আঞ্চলিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না, নিজেদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিধি বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যেই ন্যাটোর সদস্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশ বুলগেরিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে সতর্ক বার্তা পাঠিয়েছে, কারণ মার্কিন রিফুয়েলিং ও সামরিক যুদ্ধবিমানগুলো বুলগেরিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করে তাদের ওপর নজরদারি বাড়াচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই সাংবাদিকদের স্পষ্ট জানান, যেকোনো আগ্রাসনের মূল উৎস এবং কেন্দ্রবিন্দুকে লক্ষ্যবস্তু করার পূর্ণ ও বৈধ অধিকার ইরানের রয়েছে। তিনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে ইরানের বিরুদ্ধে সাপোর্ট বা সুবিধা প্রদান আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সরাসরি আগ্রাসনের অংশীদারত্ব হিসেবেই গণ্য করা হবে। যুদ্ধের এই পুরো সময়ে ইরান এ পর্যন্ত মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ১১টি দেশে সরাসরি আঘাত হেনেছে। তবে সাইপ্রাসে ব্রিটিশ বাহিনীর ব্যবহৃত একটি সামরিক ঘাঁটিতেও আঘাত হানার পাশাপাশি তেহরান প্রমাণ করেছে যে, ভারতীয় মহাসাগরে শত শত মাইল দূরে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলা চালানোর সুনির্দিষ্ট সক্ষমতা তাদের রয়েছে। ফলে বলকান অঞ্চলের দেশ বুলগেরিয়ার মতো ইউ ও ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর হামলা হলে এই সংঘাত নিমিষেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বৃহত্তম বৈশ্বিক রূপ নেবে। অন্যদিকে, সেনানেতা মহসিন রেজাইও একইভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে, ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে আমেরিকার এই অর্থনৈতিক যুদ্ধে যে দেশই অংশ নেবে বা কোনো ধরনের সাহায্য করবে, তাকেই তারা সরাসরি যুদ্ধের প্রতিপক্ষ বলে ধরে নেবেন।
সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে ইরানের পারমাণবিক নীতি নিয়ে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের অব্যাহত অভিযোগ ও সামরিক হামলার পরেও এতদিন ধরে ইরান দাবি করে আসছিল যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সুর বদলাতে শুরু করেছে। খামেনি তার জীবদ্দশায় এক ধর্মীয় ফতোয়ার মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা হারাম ঘোষণা করেছিলেন। তবে এখন দেশটির নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে আসার পক্ষে সোচ্চার হয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইরানের ভূগর্ভস্থ গোপন বাংকারে অন্তত আধা টন অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, যা খুব অল্প সময়ের মধ্যে পারমাণবিক বোমায় রূপান্তর করা সম্ভব। ইরানি আইনপ্রণেতারা নিশ্চিত করেছেন যে, দেশটির পার্লামেন্টে এনপিটি থেকে নিজেদের তুলে নেওয়ার ওপর জোর আলোচনা চলছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় টিভিতে এক বিরল সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় মহসিন রেজাই খোলাখুলিভাবেই ইরান কর্তৃক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সারা বিশ্ব এখন প্রশ্ন তুলছে এনপিটির আদৌ কোনো কার্যকারিতা রয়েছে কি না। রেজাই আরও যুক্তি দেখান, আমেরিকা যখন আমাদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এমন ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে নেমেছে, তখন দেশটির সাধারণ মানুষ ও নীতিনির্ধারকরা তো প্রশ্ন তুলতেই পারেন যে কেন আমরা নিজেদের সুরক্ষায় পরমাণু বোমা তৈরি করব না?
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো সিনা তুসি পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে জানান, ওয়াশিংটন যে সর্বাত্মক অবরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক অভিযানের মিশ্রণ ঘটিয়েছে, তা দিয়ে তেহরানকে মূল দাবি থেকে বিচ্যুত করা অসম্ভব। তেহরান কখনো তাদের অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং হরমুজ প্রণালিতে তাদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণের দাবি থেকে পিছপা হবে না। বরং ইরানের কাছে নিজেদের ওপর চাপানো এই বিপুল আর্থিক ও সামরিক ক্ষতিকে আঞ্চলিক স্তরে অন্যান্য দেশের ওপর ছড়িয়ে দেওয়ার যথেষ্ট সক্ষমতা ও সামর্থ্য রয়েছে। ওয়াশিংটন যত বেশি সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধের চেষ্টা করবে, তাদের তত বেশি দেশের সমর্থনের প্রয়োজন পড়বে, আর ঠিক একইভাবে তেহরানও তাদের ওপর পাল্টা চাপ প্রয়োগের জন্য নতুন নতুন পক্ষ ও নতুন নতুন লক্ষ্যবস্তু খুঁজে নেবে। তার মতে, ইরানের বিদ্যমান কৌশল হবে মূলত একাধারে বিকল্প অর্থনৈতিক পথ খুঁজে টিকে থাকা এবং অন্যদিকে আমেরিকাকে থামানোর জন্য আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও ভয়াবহতার দিকে ঠেলে দেওয়া।
সূত্র: সিএনএন
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন