প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে বেহাল অবস্থায় রয়েছে। কোমলমতি শিশুরা যখন বাবা-মায়ের কোলে থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের স্নেহস্পর্শে নিজেদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে, তখন সেসব শ্রেণিকক্ষে তাদের সময় কাটছে আতঙ্ক, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায়। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের ছাদ থেকে মাথার উপর খসে পড়ছে পলেস্তারা, যা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় একটি বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু পলেস্তারা নয়, ছাদের খসে পড়া অংশের নিচে বেরিয়ে রয়েছে জরাজীর্ণ মরিচাপড়া রড, যা শিক্ষার্থীদের আতঙ্কের কারণ। শ্রেণিকক্ষের সংকটও রয়েছে। কিছু শ্রেণিকক্ষে কাপড়ের পর্দা টাঙানো হয়েছে, যার দুই পাশে একসঙ্গে চলছে দুই শ্রেণির পাঠদান। একদিকে শিক্ষকের পাঠদান চললেও পাশের শ্রেণির কোলাহল শিক্ষার্থীদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অর্ধশতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমন করুণ চিত্র দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে এই পরিস্থিতিতে।
দৌলতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২১৭টি। এর মধ্যে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে নির্মিত অনেক বিদ্যালয় ভবন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। কিছু বিদ্যালয় ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় বিকল্প স্থানে পাঠদান চলছে, আবার কিছু ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। শিক্ষা অফিসের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ হয়নি এবং পুরোনো ভবনগুলোও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
উপজেলার ৯১ নম্বর চর আমলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিন কক্ষবিশিষ্ট মূল ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে একটি পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে পাঠদান কার্যক্রম চালাচ্ছেন। পাশের ৯২ নম্বর পিপুলবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। সেখানে জরাজীর্ণ ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান চলছে। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় সিঁড়ির কক্ষকে অফিস হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে। ছাদ ও দেয়ালের ভাঙাচোরা অবস্থায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ওই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আনাস জানায়, "আমাদের স্কুল ভবনে অনেক সমস্যা। মাঝে মধ্যেই ছাদের পলেস্তারা বা অংশ ভেঙে পড়ে। এ কারণে ক্লাসে স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি। বিদ্যালয়ের ভবনটি নতুন করে তৈরি করে দিলে নিরাপদে ও সুন্দর পরিবেশে লেখাপড়া করতে পারব।" একই শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিয়া খাতুন জানায়, জরাজীর্ণ ভবনের কারণে তারা শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিকভাবে বসতে পারে না। যেকোনো সময় ছাদের সিমেন্ট বা রড খুলে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, দ্রুত শ্রেণিকক্ষ মেরামত কিংবা নতুন ভবনের ব্যবস্থা করা হোক।
শুধু জরাজীর্ণ ভবনই নয়, শ্রেণিকক্ষের সংকটও রয়েছে। উপজেলার ১৬৫ নম্বর তালবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষের মাঝখানে কাপড়ের পর্দা ঝুলিয়ে দুভাগ করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুমি খাতুন জানান, "কক্ষ সংকটের কারণে বাধ্য হয়েই পর্দা টাঙিয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে।"
তালবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিন বলেন, বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ১০৮ জন। স্বাভাবিকভাবে একটি শ্রেণিকক্ষে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী বসতে পারে। কিন্তু কক্ষের অভাবে কখনো দুটি শ্রেণির ৪০ থেকে ৪২ জন শিক্ষার্থীকে এক কক্ষে বসিয়ে পাঠদান করাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, "শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় পড়ালেখা স্বাভাবিক ও সচল রাখতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটি কক্ষকে পর্দা দিয়ে দুই ভাগ করে পাঠদান চালাতে হচ্ছে।" নতুন ভবন বরাদ্দ না পেলে শিক্ষার মান ধরে রাখা কঠিন হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকা প্রসঙ্গে দৌলতপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাক আহম্মেদ জরাজীর্ণ ভবন ও শ্রেণিকক্ষ সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, "উপজেলায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি বিদ্যালয়ে নতুন ভবন হয়নি এবং পুরোনো ভবনগুলো জরাজীর্ণ। ইতোমধ্যে অনেক বিদ্যালয় পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিকল্প ব্যবস্থায় পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে নির্মিত ভবনগুলো চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তালিকা পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি পিডিপি-৪ এর আওতায় অনেক উন্নয়ন কাজ হয়েছে। সামনে পিডিপি-৫ এর কার্যক্রম শুরু হলে আশা করা হচ্ছে, আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে এসব ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে এবং জরাজীর্ণ ভবনের সমস্যার সমাধান হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন