প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পর্যটন শহর কক্সবাজারের একটি হোটেল থেকে ছয় চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করার পর পুলিশের সহযোগিতায় ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ নিয়ে সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে, চট্টগ্রাম নগরীর একটি ভবন ঘেরাও করে নারী শিশুসহ ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিইউ) ও খুলশী থানার দুটি বিশেষ টিম ২২ ঘণ্টা ধরে নগরীর খুলশীর কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের একটি আটতলা বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করে।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে অভিযানটি শেষ হয়, যা শুরু হয়েছিলো বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টায়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২০ জন নারী এবং বেশ কয়েকজন শিশু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে, কেন এবং কোন অপরাধের ভিত্তিতে এতো বিপুল সংখ্যক বিদেশিকে গ্রেফতার করা হলো, সে সম্পর্কে নগর পুলিশের কর্মকর্তারা সঠিকভাবে কোনো জবাব দিতে পারেননি। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো তথ্যও পুলিশের কাছে নেই।
এ পরিস্থিতিতে পুলিশের এই অতি উৎসাহী ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা অপরাধের প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে বিদেশিদের গ্রেফতার করার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদি তারা অপরাধে জড়িত হয়ে থাকেন, তবে বিদেশি নাগরিকদের বিচার সম্ভব। এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। তবে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগে তাদেরকে অপরাধীর মতো আচরণ করা দেশের ইমেজের জন্য ক্ষতিকর বলেও অনেকের মত।
যেখানে নগরীর আইন-শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে পেশাদার সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের ধরতে পুলিশ চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, সেখানে অভিযোগ ছাড়াই ব্যবসার জন্য আসা বিদেশিদের আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া এবং আদালতে চালান দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তবে অভিযান শেষে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো অপরাধের প্রমাণ দিতে পারেনি পুলিশ। পুলিশের ধারণা, তারা অপরাধ করার উদ্দেশ্যে ওই ভবনে একত্রিত হয়েছিল। তবে ধারণার ভিত্তিতে বিদেশি নাগরিকদের আসামির মতো গ্রেফতার করা যায় কিনা, সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ।
মাত্র দেড় মাস আগে এক প্রবাসী ওই বাড়িটি ভাড়া নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেন বিদেশিরা। অভিজাত খুলশি এলাকায় অনেক ভবনে বিদেশি নাগরিকরা দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। চট্টগ্রামে বিদেশি বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত কলকারখানায় কর্মরত বিদেশিরা ওইসব এলাকায় ভাড়া বাসা নিয়ে একত্রে বসবাস করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ হঠাৎ করে আবাসিক এলাকার ওই ভবনটি ঘেরাও করে। তারা ভবনের প্রতিটি তলায় গিয়ে বাসিন্দাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ব্যাপক তল্লাশি শুরু করেন। তবে ভাষাগত সমস্যার কারণে কেউ কারো কথা বুঝতে পারছিলেন না। ওই ভবনের আশপাশের বাসিন্দারা বলছেন, ফ্যাসিবাদি আমলে কথিত জঙ্গি নাটকের মহড়া দেয়ার স্টাইলে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। তবে অভিযান শেষে তাদের কাছ থেকে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন সেট, ল্যাপটপ এবং কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হলেও অবৈধ কিছু পাওয়া যায়নি।
গতকাল বিকেলে দামপাড়া সিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে অভিযানের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহম্মেদ। তার কাছে প্রশ্ন ছিলো, কি অপরাধে এসব বিদেশিদের গ্রেফতার করা হলো। তিনি জানান, "আমাদের কাছে তথ্য ছিলো তারা ওই ভবনে অবস্থান করে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘবদ্ধভাবে আর্থিক প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ করছে।" অভিযানে এমন কোনো অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে কিনা, উত্তরে অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, "না। তবে তারা প্রতারণা করেছেন কিনা সেটা তদন্ত করা হচ্ছে।" তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা ডিভাইস ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে এবং এর জন্য কিছুটা সময় লাগবে।
প্রতারণার কৌশল ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে ফয়সাল আহম্মেদ জানান, তারা মূলত বিভিন্ন ওয়েবসাইট হ্যাক করে। এরপর বিভিন্ন জনকে অনলাইন জুয়া খেলার অফার দেয় এবং চাকরির ভুয়া ফাঁদ তৈরি করে। লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে স্ক্যামারদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চলায় তারা সেখানে কাজগুলো করতে না পেরে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে। এখানে তারা প্রতারণার ফাঁদ পাতা মাত্র শুরু করেছিল। তিনি আরও বলেন, "আমরা তাদের যত কম্পিউটার ও ল্যাপটপ পেয়েছি, কোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সেগুলোর ফরেনসিক রিপোর্ট এলে কার কার সাথে তারা প্রতারণা করেছে, সেই বিষয়গুলো পুরোপুরি উঠে আসবে।" গ্রেফতারকৃতদের অনেকের পাসপোর্ট না থাকার বিষয়ে ফয়সাল আহম্মেদ জানান, "আমরা জানতে পেরেছি তাদের পাসপোর্টগুলো এক বাংলাদেশির কাছে জমা রাখা আছে।" স্থানীয় ওই ব্যক্তির সহযোগিতাতেই তারা এই বাসাটি ভাড়া নিয়েছে।
খুলশী থানার ওসি আব্দুর রহিম বলেন, "তারা একসাথে একটি ভবনে অবস্থান নিয়েছে, এতে বুঝা যায় তারা ‘সংঘবদ্ধ’।" তাছাড়া, তাদের কাছে থাকা ডিভাইস দেখে মনে হয়েছে তারা প্রতারণামূলক কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অপরাধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এই ধারণা থেকে কাউকে গ্রেফতার করা যায় কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, "ওপর থেকে তথ্য ছিলো তারা অপরাধে জড়িত।" যেসব ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে, সেগুলো দিয়ে কোন প্রতারণা বা অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে কিনা সেটাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি জানিয়ে ওসি বলেন, "এসব তদন্ত সাপেক্ষ, তদন্তে সময় লাগবে।"
তিনি ধারণা করছেন, এদের সাথে দেশি চক্রও জড়িত রয়েছে। ভাষা বুঝতে না পারায় অনেক কিছু জানা যায়নি। তাদের অনেকের কাছে তখন পাসপোর্ট পাওয়া যায়নি, তবে পরিবার এবং দূতাবাসের পক্ষ থেকে পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওসি জানান, আটক অনেকে বলেছেন তারা ব্যবসার কাজে এই দেশে এসেছেন কিছুদিন আগে। যার মাধ্যমে চট্টগ্রাম আসেন এবং এই ভবনটি যিনি ভাড়া নেন, তাদের অনেকের পাসপোর্ট তার কাছে জমা আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর পুলিশের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, একটি সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে ওই বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। সেখানে তাৎক্ষণিক অপরাধের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তারা ওই ভবনে বসবাস করছেন, কেউ কেউ পরিবার নিয়ে আছেন। সন্দেহজনকভাবে তাদের আটক করা হয়েছে।
ওসি আব্দুর রহিম জানান, গ্রেফতার ৬৩ বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্রতারণা ও অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২১, ২২ ও ২৩ ধারায় মামলা হয়েছে। গ্রেফতার ৬৩ জনের মধ্যে লাওসের ৩৪ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন, নেপালের দুই জন এবং ভিয়েতনামের একজন রয়েছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন