প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সার উৎপাদনের পরিমাণ কমছে।
পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি ঘটছে। এই পরিস্থিতির প্রভাব পণ্যের দাম, কৃষি, মানুষের আয়-রোজগার এবং কর্মসংস্থানেও পড়ছে। যদি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে, চলতি বছরে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল এমন মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ে করা মূল্যায়নে এসব ঝুঁকির বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। সরকারকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই মূল্যায়নটি করা হয়।
বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থানে এসে পৌঁছেছে, যখন অর্থনীতি ইতোমধ্যে চাপে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত এবং সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে নতুন কর্মসংস্থান প্রত্যাশিত হারে তৈরি হচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়ে যাবে। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে এই সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হারাতে পারেন আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষ।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এই বছর দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব প্রায় ১০ শতাংশ থাকবে।
জ্বালানির দাম ধাপে ধাপে সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলে পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যা শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচকেও প্রভাবিত করবে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। তিনি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে মূল্যস্ফীতি আরও কমত।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সরাসরি প্রভাব দেশের জ্বালানি খাতে পড়ছে। বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু দেশে গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ থেকে ২৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের দামের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। সংকটের মধ্যে সেপ্টেম্বরে সরবরাহের জন্য দুটি এলএনজি চালান কিনতে বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিটে ২৪ ডলারের বেশি দিতে হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সব মিলিয়ে ভর্তুকির চাপ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। এতে অন্যান্য খাতে সরকারি ব্যয় কমার ঝুঁকি রয়েছে।
জ্বালানি সংকট কৃষিতেও প্রভাব ফেলছে। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সার উৎপাদন ও আমদানিতে সমস্যা হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন ছোট কৃষকরা।
বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি সার ব্যবহার করা হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণের বেশি। দেশে সার উৎপাদনের জন্যও গ্যাস প্রয়োজন। ইতোমধ্যে ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার পাঁচটিকে গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এদিকে ইউরিয়ার দামও বেড়ে গেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘ হলে সারের দাম দ্বিগুণ হতে পারে।
জ্বালানি ও সরবরাহ সংকটে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ছয় হাজার ২০০ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, ফলে জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে।
দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল আনে। এ ছাড়া হাসপাতালের ৯০ শতাংশের বেশি সরঞ্জাম আমদানিনির্ভর। তাই আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট ও জাহাজভাড়া বৃদ্ধি পেলে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব কর্মসংস্থানে পড়তে শুরু করেছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও কাজের সময় কমানো হয়েছে, আবার জ্বালানি সংকটে কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে।
তাঁর মতে, কারখানা বন্ধ হওয়া ও শ্রমিকদের চাকরি হারানোর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ৬ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কা সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য শুধুমাত্র জ্বালানি সংকট নয়; বরং কর্মসংস্থান, কৃষি, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য এবং স্বাস্থ্যসেবায় একযোগে চাপ তৈরি করছে। সংকট দীর্ঘ হলে এর বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করতে হবে নিম্নআয়ের মানুষকে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন