প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ রাব্বি (ইহুদি ধর্মীয় নেতা)। তারা সতর্ক করে বলেছেন যে, ফিলিস্তিনিদের ওপর চরমপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা কোনোভাবেই সহ্য করা উচিত নয়।
গত মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে পণ্য আমদানির ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে তাদের নিজস্ব ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত করার এই প্রক্রিয়া মূলত 'জাতিগত নিধন' (এথনিক ক্লিনজিং)-এর সামিল।
যদিও যুক্তরাজ্যের চিফ রাব্বি স্যার এফ্রাইম মির্ভিস সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং সতর্ক করে বলেছেন যে, এই পদক্ষেপ তাদের আরও উসকে দিতে পারে যারা "ইহুদিদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ঘৃণা ব্যবহার করে।"
তবে অন্যান্য রাব্বি, বিশেষ করে ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রগতিশীল ধারার নেতারা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের এই পরিকল্পনাকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। তারা অন্যান্য ইহুদি নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন বসতি স্থাপনকারীদের এই সহিংসতাকে তারা চেপে না যান বা উপেক্ষা না করেন।
মাসোরতি জুডাইজম-এর প্রবীণ রাব্বি জোনাথন উইটেনবার্গ দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন: "পশ্চিম তীরে আজ যা ঘটছে তা হলো 'হিলুল হাশেম'—অর্থাৎ ঈশ্বরের পবিত্র নামের চরম অবমাননা। এমন পরিস্থিতিতে আমরা চুপ করে বসে থাকতে পারি না।" তিনি আরও যোগ করেন, "শান্তিতে বাঁচতে চাওয়া ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিস্থিতি। এমনকি এটি ইসরায়েলের নিজেদের ভবিষ্যতের জন্যও ভয়াবহ।"
উইটেনবার্গ আরও বলেন: "আমাদের অবশ্যই প্রতিবাদ জানাতে হবে। মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং স্বয়ং ইসরায়েল ও ইহুদি ধর্মের স্বার্থেই আমাদের কথা বলতে হবে। আমরা মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারি না।" সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের সাথে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি গ্রাম 'উম্ম আল-খাইর' সফর করে নিজের চোখে সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন রাব্বি উইটেনবার্গ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, "এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সঠিক সময়।"
এদিকে বুধবার প্রকাশিত 'ইউগভ'-এর এক তাৎক্ষণিক জরিপে দেখা গেছে, শতকরা ৫২ ভাগ উত্তরদাতা ব্রিটিশ সরকারের এই বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করেছেন, যেখানে মাত্র ১৭ ভাগ মানুষ এর বিরোধিতা করেছেন।
বুধবার 'প্রাইম মিনিস্টার্স কোশ্চেনস' (পিএমকিউ) সেশনে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ কমন্সে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম বলেন, "আজকের এই কঠিন ও বিপজ্জনক বিশ্বে ব্রিটেনকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। ব্রিটেনকে নেতৃত্বের ভূমিকা দেখাতে হবে এবং সব ধরনের অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।" নিউ লন্ডন সিনাগগের রাব্বি জেরেমি গর্ডন, যিনি সরকারের এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তিনি বলেন: "চরমপন্থী বসতি স্থাপনকারী এবং তাদের সমর্থকদের সামনে নিশ্চুপ থাকা, নিষ্ক্রিয়তা প্রদর্শন করা কিংবা তাদের তুষ্ট করার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ ভুল।"
তিনি আরও বলেন, "এসব বসতি স্থাপনকারীদের কৌশলই হলো—বিশ্বের ভালো মানুষ বা ইহুদিরা তাদের সমস্ত অবৈধ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে নমনীয়ভাবে দেখবে অথবা এড়িয়ে যাবে।" লন্ডনের কিংসটন লিবারেল সিনাগগের রাব্বি লেভ টেলরও এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা জারি করে "সরকার সঠিক পথেই এগোচ্ছে।"
বিতর্কিত 'ই-ওয়ান' করিডোরে ইসরায়েলের নতুন করে বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে যুক্তরাজ্য সরকার এই পদক্ষেপ নিল। উল্লেখ্য, ই-ওয়ান এলাকায় নতুন কোনো নির্মাণকাজ শুরু হলে তা পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশকে পূর্ব জেরুজালেম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। ফলে ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ও অখণ্ড ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ভৌগোলিক সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নস্যাৎ হয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, অধিকৃত ভূখণ্ডে নির্মিত সমস্ত ইসরায়েলি বসতি সম্পূর্ণ অবৈধ—যা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) কর্তৃক পুনর্নুমোদিত হয়েছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিলিব্যান্ডের এই ঘোষণার পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের সাথে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হলেও, কানাডা ও ফ্রান্সসহ বিশ্বের আরও ১১টি দেশ যুক্তরাজ্যের এই পথ অনুসরণ করে একই ধরণের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের এই বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার টাইমিং নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত মন্তব্য করা থেকে বিরত ছিলেন। তিনি জানান, এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তিনি প্রথমে ইসরায়েলের সাথে কথা বলে তাদের মনোভাব জানতে চান।
টেক্সাসে একটি রিপাবলিকান কনভেনশনে যাওয়ার পথে ইউকে-র বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে ট্রাম্প বলেন: "আমি বিষয়টি দেখেছি এবং আমি শিগগিরই ইসরায়েলের সাথে কথা বলব। তারা কী ভাবছে তা আমি আগে জেনে নিতে চাই।" তিনি আরও বলেন, "সেখানে ঠিক কী ঘটছে তা আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি, কিন্তু আমি জানতে চাই হঠাৎ করে কেন যুক্তরাজ্য এই সিদ্ধান্ত নিল?"
তবে জানা গেছে, গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী বার্নহামের সাথে এক ফোনালাপে যখন তাকে এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছিল, তখন ট্রাম্প এর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো আপত্তি জানাননি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন