প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে কাঙ্খিত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কিছু সুযোগ তৈরি হয়েছে, কিন্তু মাত্র দুটি সেতুর অভাবে রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের প্রায় এক লাখ মানুষ এখনো মূল ভূখণ্ড থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে।
স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ হলো, ভাগজোত ও সুখারঘাটে সেতু না থাকায় বছরের পর বছর ধরে তারা চরম দুর্ভোগ পোহাতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্ষাকালে উত্তাল পদ্মা নদী পারাপারের তাদের একমাত্র ভরসা হলো নৌকা। আর শুষ্ক মৌসুমে বালুচর পেরিয়ে তাদের ভ্যান, ট্রলি, মোটরসাইকেল কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে চলাচল করতে হয়। এর ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যক্রমে তারা প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন।
এখানে, উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের এই চরাঞ্চলে কিছু সড়ক নির্মাণ হয়েছে, তবে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই, যার কারণে বাসিন্দারা এর সুফল পুরোপুরি পাচ্ছেন না।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে জরুরি রোগীদের। মুমূর্ষু রোগীকে উপজেলা বা জেলা শহরের হাসপাতালে নিতে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই পথে রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে। পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদিত ধান, পাট, ভুট্টা ও সবজি বাজারজাত করতেও বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে, ফলে তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভাগজোত ঘাটে ৩৫০ মিটার এবং সুখারঘাটে ৯৬ মিটার দীর্ঘ দুটি সেতু নির্মাণের জন্য প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রায় সব প্রার্থীই ভাগজোত ও সুখারঘাটে সেতু নির্মাণ, উন্নত সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন, তবে নির্বাচন শেষে এই প্রতিশ্রুতিগুলো সাধারাণত বাস্তবায়নের মুখ দেখে না। সরকারের এবং জনপ্রতিনিধির বদল হলেও চরবাসীর জীবনচিত্র পরিবর্তিত হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন জানালেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে চরাঞ্চলের শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষকরা এখানে দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে চান না, কেউ যোগ দিলেও অল্প সময়ের মধ্যে বদলি নিয়ে চলে যান।
তিনি আরও জানান, এলাকাটিতে কোনো পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। রোগী নিয়ে সেখানে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। কৃষকদেরও নৌকা কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে করে ফসল বাজারে নিতে হয়, যা পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দেয়।
গৃহবধূ শেফালী খাতুন জানালেন, পরিবারের অসুস্থ সদস্যদের হাসপাতালে নিতে চরম দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হয়, কারণ বালুচর পেরিয়ে ভ্যান বা ঘোড়ার গাড়িতে রোগীকে বহন করতে হয়।
উপজেলা প্রকৌশলী আসাদ উল্লাহ বাচ্চু জানান, ভাগজোত ও সুখারঘাটে সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বাজেট অনুমোদন পেলেই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল বলেন, দুটি সেতু নির্মাণের মাধ্যমে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই হবে না, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসবে।
কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা জানিয়েছেন, ভাগজোত ও সুখারঘাটে সেতু নির্মাণ এবং নদীভাঙন রোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনের জন্য চেষ্টা চলছে।
চরবাসীর প্রত্যাশা, এবার আর প্রতিশ্রুতি সীমাবদ্ধ থাকবে না, সেতু নির্মাণের উদ্যোগে। যদি ভাগজোত ও সুখারঘাটে দুটি সেতু নির্মিত হয়, তাহলে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের মানুষ মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারবেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন