প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নেপালের রসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলায় তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১৫৭ জনে পৌঁছেছে। এখনও অন্তত ৪০৩ জনের খোঁজ মেলেনি।
নিখোঁজদের মধ্যে ২৬টি দেশের ৩৪১ জন নাগরিক এবং ৬২ জন নেপালি নাগরিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের একটি বড় অংশ কৈলাস মানসসরোবরের উদ্দেশ্যে তীর্থযাত্রায় ছিলেন। নিখোঁজ তীর্থযাত্রীদের মধ্যে ১০৫ থেকে ১৩৩ জন ভারতীয় এবং ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয় রয়েছেন। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে এই আকস্মিক বন্যার ফলে কৈলাস মানসসরোবর তীর্থযাত্রা আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
এই বন্যায় কৈলাস পর্বত এবং মানসসরোবর হ্রদে যাওয়ার প্রধান রুটের রাস্তা, সেতু এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে।
কৈলাস মানসসরোবর যাত্রা কেবল একটি ভ্রমণ বা সাধারণ তীর্থযাত্রা নয়; এটি এক পরম আত্মিক ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির সন্ধান, যা তীব্র শারীরিক কষ্টের ঊর্ধ্বে। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং তিব্বতের বোন ধর্মের কোটি কোটি মানুষের কাছে এই স্থানটি পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র এবং রহস্যময় কেন্দ্র। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, কৈলাস পর্বত সাধারণ কোনো পর্বত নয়।
এটি দেবকূলের প্রধান ভগবান শিব এবং মাতা পার্বতীর আদি বাসস্থান হিসেবে বিবেচিত। ভক্তদের বিশ্বাস, কৈলাসে স্বয়ং শিব সশরীরে বিরাজ করেন। মনে করা হয়, মানসসরোবর হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে পরমপিতা ব্রহ্মার মন থেকে, যার কারণেই এর নাম মানসসরোবর। এই হ্রদের জল অত্যন্ত পবিত্র।
বিশ্বাস করা হয়, মানসসরোবরের পবিত্র জলে একটি ডুব দিলে মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের সমস্ত পাপ ধুয়ে মুছে যায়। আর কৈলাস পর্বতের চারপাশে ৫২ কিলোমিটারের এক চক্কর বা 'পরিক্রমা' সম্পূর্ণ করতে পারলে মানুষ মোক্ষ লাভ করে, অর্থাৎ সে জন্ম ও মৃত্যুর চিরন্তন চক্র থেকে মুক্তি পায়। তিব্বতি এবং হিন্দু উভয় ঐতিহ্যেই কৈলাস পর্বতকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র মনে করা হয়। বলা হয়, এটি স্বর্গ ও মর্ত্যের সংযোগস্থল। সাধক এবং আধ্যাত্মিক অন্বেষণকারীদের মতে, এখানকার মহাজাগতিক শক্তির স্তর এতটাই তীব্র যে, এখানে ধ্যান করলে অতি দ্রুত আত্মিক উন্নতি ঘটে এবং ভেতরের কুপ্রবৃত্তিগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।
মাউন্ট এভারেস্টে হাজার হাজার মানুষ উঠলেও, ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উচ্চতার কৈলাস পর্বতের চূড়ায় আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ পা রাখতে পারেনি। চীনের সরকার এবং ধর্মীয় বিশ্বাস উভয় কারণে এখানে আরোহণ নিষিদ্ধ। লোককথা আছে, যিনিই এই পাহাড়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন, তিনি হয় দিক হারিয়েছেন, না হয় তীব্র আবহাওয়ায় প্রাণ হারিয়েছেন। এই চিরন্তন এবং অলৌকিক রহস্য মানুষকে এক তীব্র চৌম্বকীয় আকর্ষণে কাছে টানে। ভক্তদের কাছে এই যাত্রার শারীরিক কষ্ট হলো অহংকার ও অহমিকা বিসর্জনের একটি প্রক্রিয়া। তারা বিশ্বাস করেন, শিবের ডাক না এলে কেউ কৈলাশে যেতে পারে না।
১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর এই যাত্রা প্রায় দুই দশকের জন্য স্থগিত ছিল। ১৯৮১ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে একটি চুক্তির পর এটি পুনরায় চালু হয়। এরপর কোভিড-১৯ মহামারির সময় এটি আবার বন্ধ হয়ে যায় এবং দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর পর ২০২৫ সালে পুনরায় যাত্রাটি শুরু হবে।
ভারতীয় তীর্থযাত্রীরা মূলত তিনটি প্রধান রুটের মাধ্যমে কৈলাস মানসসরোবরে পৌঁছাতে পারেন। উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস রুটটি দিল্লি থেকে শুরু হয়ে আলমোড়া ও ধারচুলা হয়ে এগিয়ে যায়। এরপর গুঞ্জি এবং লিপুলেখ পাশ দিয়ে তিব্বতে প্রবেশের জন্য হেঁটে বা ট্রেকিং করে যেতে হয়। সিকিম নাথু লা পাস রুটটি দিল্লি থেকে গ্যাংটক হয়ে নাথু লা পাস অতিক্রম করে এবং এরপর গাড়ির সাহায্যে তিব্বতের ভেতরে এগিয়ে যায়। সরকারি মাধ্যমে পরিচালিত এই রুটে ট্রেকিং বা হাঁটার পরিমাণ কম এবং গাড়িতে ভ্রমণের সুযোগ বেশি। ফলে এটি প্রবীণ নাগরিকদের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ, যদিও পুরো যাত্রা সম্পন্ন করতে ২০ দিনেরও বেশি সময় লেগে যায়।
তৃতীয় রুটে তীর্থযাত্রীরা কাঠমান্ডু থেকে বিমানে বা গাড়িতে করে নেপালগঞ্জ বা সিমিকোট যান এবং সেখান থেকে হিলসা হয়ে অথবা সড়কপথে তিব্বতে প্রবেশ করেন। সরকারিভাবে পরিচালিত রুটগুলোর মতো না হয়ে, এই রুটটি বেসরকারি ট্যুর অপারেটরদের দ্বারা পরিচালিত হয়। এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং কঠিন ট্রেকিং এড়ানোর জন্য এতে হেলিকপ্টারের ব্যবস্থাও রয়েছে। নেপালের আকস্মিক বন্যায় এই রুটটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৈলাস মানসসরোবর যাত্রায় তীর্থযাত্রীদের সাড়ে ৪ হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায় যেতে হয়, যেখানে অক্সিজেনের মাত্রা অত্যন্ত কম থাকে। তীর্থযাত্রীদের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, ভূমিধস এবং দুর্গম ভূখণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়। এর সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো কৈলাস পর্বতের চারপাশের ৫২ কিলোমিটারের পরিক্রমা, যার মধ্যে প্রায় ৫ হাজার ৬৩০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ডলমা লা পাস অতিক্রম করা অন্তর্ভুক্ত।
শারীরিক কষ্ট ছাড়াও কৈলাস মানসসরোবর যাত্রায় যেতে নানান সরকারি অনুমতি ও ভিসা লাগে। শারীরিক সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হয়। ঝুঁকি বিবেচনায় ভারত সরকার এ যাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। নির্ধারিত কোটার বাইরে কেউ এ যাত্রায় যেতে পারেন না। এমনকি কেউ চাইলেও একা এ যাত্রায় সামিল হতে পারবেন না। সরকারি ব্যবস্থাপনা বা নির্ধারিত বেসরকারি ট্রাভেল অপারেটররাই এ তীর্থযাত্রার আয়োজন করে থাকে। এত বাধার পরও প্রতিবছর ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ পুণ্যের আশায় কৈলাস মানসসরোবর যাত্রা করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন