প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নারায়ণগঞ্জের বিএনপির রাজনীতিতে মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ, ঘটনাবহুল এবং নানা উত্থান-পতনে ভরা। তিনি মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের চারবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং করোনাকালে মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য ‘করোনা বীর’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। বর্তমানে তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে নেই। তবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, মাঠের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তার উপস্থিতি এখনও আলোচনায় রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় থাকার ফলে খোরশেদ একাধিকবার গ্রেপ্তার, কারাবরণ ও মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলার সংখ্যা ৮০টি থেকে ৮৫টির বেশি হবে। হরতাল-অবরোধের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সামনের সারিতে থাকার কারণে তিনি প্রায় ৮ বার গ্রেফতার হয়েছেন। জেল গেইট থেকে তাকে ৬ বার গ্রেফতার করা হয়েছে।
মহানগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক থেকে সভাপতি, দুই পর্যায়েই দায়িত্ব পালন করেছেন খোরশেদ। ওই সময় নারায়ণগঞ্জে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাকে সামনের সারিতে দেখা গেছে। হরতাল, অবরোধ, মিছিল, সমাবেশসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার ফলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, লাঠিচার্জ এবং গ্রেপ্তারের ঘটনাও তার রাজনৈতিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
২০১৬ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনি মহানগর যুবদলের সভাপতি ও কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তার বিরুদ্ধে থাকা মামলায় পুলিশি তৎপরতা এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের হয়রানিও তাকে দমাতে পারেনি। রাজপথের কর্মসূচিতে তার সক্রিয়তা নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির মাঠের রাজনীতিতে খোরশেদের একটি আলাদা সাংগঠনিক পরিচিতি তৈরি করেছে।
খোরশেদের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হলো গ্রেপ্তার ও কারাবরণ। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে হরতাল-অবরোধসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার কারণে তাকে প্রায় ১৪ বার কারাবরণ করতে হয়েছে। এমনকি কারাগার থেকে বের হওয়ার পর জেলগেট থেকেও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেপ্তারের এই দীর্ঘ ইতিহাস তাকে বিএনপির মাঠপর্যায়ের ‘পরীক্ষিত’ নেতাদের একজন হিসেবে পরিচিতি দেয় বলে তার অনুসারীদের দাবি।
রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবেও খোরশেদের রয়েছে দীর্ঘ সফলতা। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা ও পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তিনি মোট চারবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়েছেন।
২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে কমিশনার হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর ২০১১ ও ২০১৬ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও কাউন্সিলর পদে জয় পান। ২০২২ সালের নির্বাচনে তিনি একই ওয়ার্ড থেকে বিজয়ী হন। ফলে টানা চারবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়ার রেকর্ড গড়েন তিনি।
এই ধারাবাহিক বিজয়কে তার স্থানীয় জনপ্রিয়তার অন্যতম বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে দলীয় প্রতীকের বাইরে কাউন্সিলর নির্বাচনে ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক তৈরি করতে সক্ষম হওয়াই তার রাজনৈতিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময়। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিদের দাফন ও সৎকার নিয়ে যখন ভয় ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মৃতদেহ দাফনে এগিয়ে আসেন খোরশেদ।
নিজের অনুসারী ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘টিম খোরশেদ’। এই দলের সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের দাফন ও সৎকারে অংশ নেন। দেড় শতাধিক মরদেহ দাফন ও সৎকারের তথ্য পাওয়া যায়।
করোনাকালে শুধু দাফন নয়, খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি ও বিতরণ, অক্সিজেন ও প্লাজমা সহায়তা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নানা উদ্যোগও নেয় ‘টিম খোরশেদ’। এ কারণে রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্যও সারাদেশে পরিচিতি পান তিনি।
করোনাকালে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে খোরশেদকে ‘করোনা বীর’ বা ‘করোনা হিরো’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০২২ সালের নির্বাচনের সময় তাকে ‘করোনা হিরো’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং তার ‘টিম খোরশেদ’-এর সারাদেশে প্রশংসিত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
করোনার ভয়াবহ সময়ে যখন মৃত ব্যক্তির মরদেহ পরিবারের সদস্যরাও স্পর্শ করতে ভয় পাচ্ছিলেন, তখন স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে দাফন ও সৎকারে অংশ নেওয়া তার রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে একটি মানবিক পরিচিতি তৈরি করে।
এমনকি ২০২১ সালে করোনার টিকা নেওয়ার সময়ও তিনি সাধারণ মানুষকে টিকা নিতে উৎসাহিত করেন। যারা নিজেরা টিকার নিবন্ধন করতে পারছেন না, তাদের জন্য তার কাউন্সিলর কার্যালয়ে বিনা খরচে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করার কথাও তিনি জানিয়েছিলেন।
খোরশেদের মানবিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি ছিল রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে মৃত ব্যক্তিদের দাফনে এগিয়ে যাওয়া। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এমন ঘটনাও এসেছে, যেখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যের মরদেহও ‘টিম খোরশেদ’ দাফন করেছে।
অর্থাৎ করোনাকালে তার মানবিক কর্মকাণ্ড দলীয় রাজনৈতিক সীমারেখার বাইরে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদাহরণ তৈরি করে। এই কারণেই তার ‘করোনা বীর’ পরিচিতি রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত হয়ে পড়ে।
করোনা মহামারি শেষ হওয়ার পরও ‘টিম খোরশেদ’-এর বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে হাসপাতালের রোগী, নার্স ও ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের জন্য উপহার দেওয়ার উদ্যোগের কথা প্রকাশিত হয়। সেখানে খোরশেদকে মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালেও তার নেতৃত্বে বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি পালন করা হয়ে গেছে। ফলে রাজনৈতিক পদ না থাকলেও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি নিজের কর্মী-সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রেখেছেন।
খোরশেদের রাজনৈতিক জীবনের বর্তমান অধ্যায়টি কিছুটা ভিন্ন। একসময় মহানগর যুবদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এই নেতা বর্তমানে সেই সাংগঠনিক পদে নেই। মহানগর বিএনপির রাজনীতিতেও তার প্রত্যাশিত অবস্থান তৈরি হয়নি। নারায়ণগঞ্জের বিএনপির রাজনীতিতে বর্তমানে খোরশেদের অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে তার রাজনৈতিক অবদান বনাম সাংগঠনিক পদ নিয়ে।
দীর্ঘ সময় যুবদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিরোধী দলের কর্মসূচিতে মাঠে ছিলেন। বহু মামলার আসামি হয়েছেন, একাধিকবার কারাগারে গেছেন। আবার চারবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। করোনাকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাফন-সৎকার করে পেয়েছেন ‘করোনা বীর’ পরিচিতি। তারপরও বর্তমানে বড় কোনো সাংগঠনিক পদে নেই তিনি।
এ কারণে তার অনুসারীদের একটি অংশ মনে করেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ ও মাঠের ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। তাদের বক্তব্য, সাংগঠনিক পদে না থাকলেও খোরশেদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মীদের একটি বড় অংশের যোগাযোগ রয়েছে।
খোরশেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের আরেকটি দিক হলো তার কর্মকাণ্ড শুধু বিএনপির প্রচলিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। করোনাকালের মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে দল-মত নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে তার পরিচিতি তৈরি হয়।
দাফন-সৎকার, অক্সিজেন, প্লাজমা, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালের রোগী, নার্স ও ট্রাফিক পুলিশের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ পর্যন্ত তার সামাজিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে খোরশেদের বর্তমান অবস্থান অনেকটা বৈপরীত্যপূর্ণ। একদিকে তিনি দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে নেই, অন্যদিকে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, চারবারের নির্বাচিত প্রতিনিধির পরিচয়, আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস এবং করোনাকালের মানবিক কর্মকাণ্ড তাকে আলাদা অবস্থান দিয়েছে।
সাংগঠনিক পদে না থাকলেও মহানগরীতে তার অনুসারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য এবং নেতৃত্বের সুযোগ পেলে তারা আবারও তার সঙ্গে সক্রিয় হতে পারেন।
২০২৬ সালেও তার সামাজিক কর্মকাণ্ডের উপস্থিতি প্রমাণ করে, রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে যাননি তিনি। বরং দলীয় পদ-পদবীর বাইরে থেকেও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
মামলা – হামলা ও কারাবরণের দীর্ঘ ইতিহাস, চারবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে জনসম্পৃক্ততা এবং করোনাকালে মানবিক ভূমিকা সব মিলিয়ে মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের রাজনৈতিক পরিচয় শুধু একটি দলীয় পদে সীমাবদ্ধ নয়।
রাজপথের আন্দোলনের পরীক্ষিত কর্মী থেকে চারবারের জনপ্রতিনিধি, আর সেখান থেকে ‘করোনা বীর’—খোরশেদের দুই দশকের পথচলায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দলীয় রাজনীতিতে তার এই অভিজ্ঞতা ও মাঠের প্রভাবের মূল্যায়ন কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন