প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশে মূল্যস্ফীতির চাপের কারণে মজুরি বৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। এর মানে হলো, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় ০ দশমিক ৪৪ শতাংশ কম। টানা তৃতীয় মাসের জন্য মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে অবস্থান করছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষের আয় এবং পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে ব্যবধানের বিষয়টি সামনে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
খাত-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে না। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে, যখন মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকে, তখন তাদের জন্য সংসারের ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা এবং শ্রমজীবী মানুষের আয় বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, আগস্ট মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ০ দশমিক ০৮ শতাংশ। অন্যদিকে, আগস্টে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে কমে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, একদিকে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধির হার কমেছে। এই দুই সূচকের বিপরীতমুখী পরিবর্তন আয় বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপের বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
মূল্যস্ফীতির চেয়ে পিছিয়ে মজুরি
মূল্যস্ফীতি সাধারণভাবে পণ্য ও সেবার গড় মূল্যস্তরের বৃদ্ধিকে বোঝায়। অন্যদিকে, মজুরি বৃদ্ধির হার শ্রমিকদের মজুরি কতটা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার একটি নির্দেশক। যখন মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকে, তখন একই পরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতে আয়ের তুলনামূলক বেশি অংশ ব্যয় করতে হয়। ফলে, যদিও আয় বৃদ্ধি পায়, সেই বৃদ্ধির পুরো সুবিধা ক্রয়ক্ষমতায় প্রতিফলিত হয় না।
সেপ্টেম্বরের হিসাবে সাধারণ মূল্যস্ফীতি এবং মজুরি বৃদ্ধির হারের ব্যবধান ০ দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, গড় হিসাবে মূল্যস্ফীতির হার মজুরি বৃদ্ধির হারের তুলনায় বেশি। তবে এ ব্যবধানের মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তি বা পরিবারের প্রকৃত আয় কতটা কমেছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কারণ, ব্যক্তিভেদে আয়, পেশা, ব্যয়ের ধরন এবং কেনাকাটার পণ্যের তালিকা ভিন্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, টানা তৃতীয় মাস মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে রয়েছে। এটি শুধুমাত্র সেপ্টেম্বরের এক মাসের ব্যবধান নয়; বরং পরপর কয়েক মাস ধরে দুই সূচকের এই অবস্থান বজায় রয়েছে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে
সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে সংযুক্ত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশে পৌঁছেছে। এক মাসে এই হার বেড়েছে ০ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি সূচক। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার বাড়লে নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয়ের হিসাবেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে কোন খাদ্যপণ্যের দাম কতটা বেড়েছে, কোন পণ্যের দাম কমেছে এবং পরিবারের ব্যয়ে তার প্রভাব কতটা পড়েছে—এসব জানতে পণ্যভিত্তিক মূল্য ও ব্যয়ের তথ্য আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়লেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিতে সামান্য হ্রাস দেখা গেছে। আগস্টে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে কমে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, এক মাসে এই হার কমেছে ০ দশমিক ০২ শতাংশীয় পয়েন্ট। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো খাদ্য মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেশি। এতে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—দুই ধরনের মূল্যস্ফীতির গতিপথ এক ছিল না। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমেছে। ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির পরিবর্তন বুঝতে উভয় সূচকের গতিবিধিই বিবেচনায় নিতে হয়।
১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৬৫ শতাংশ
পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে ১২ মাসের গড় সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আগস্টেও এ হার ছিল ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ, এক মাসে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি সামান্য কমেছে। সেপ্টেম্বরে ১২ মাসের গড় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যা আগস্টে ছিল ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ। অন্যদিকে, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির ১২ মাসের গড় আগস্টের ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়েছে। এখানে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট এবং ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট হিসাবে আগের বছরের একই মাসের সঙ্গে বর্তমান মাসের মূল্যস্তরের তুলনা করা হয়। আর ১২ মাসের গড় হিসাবে সর্বশেষ ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতিকে তার আগের ১২ মাসের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তাই এক মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি বেড়ালেও ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি সামান্য কমতে পারে।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে ক্রয়ক্ষমতার প্রশ্ন
মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে থাকলে সাধারণভাবে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ, আয় বৃদ্ধির তুলনায় পণ্য ও সেবার গড় মূল্য বেশি হারে বৃদ্ধি পেলে একই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের আয়ের বড় অংশ নিয়মিত প্রয়োজনীয় ব্যয়ে চলে যায়, তাদের ক্ষেত্রে আয় ও ব্যয়ের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে মূল্যস্ফীতি এবং মজুরি বৃদ্ধির হারের ব্যবধান থেকে সবার জীবনযাত্রার ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন নির্ধারণ করা যায় না। কোনো পরিবারের ব্যয়ে খাদ্যের অংশ বেশি, আবার কোনো পরিবারের ক্ষেত্রে বাসস্থান, পরিবহন, চিকিৎসা বা অন্যান্য সেবার ব্যয় বেশি হতে পারে। ফলে একই মূল্যস্ফীতির মধ্যেও বিভিন্ন পরিবারের ওপর প্রভাব এক রকম নাও হতে পারে।
এ ছাড়া, মজুরি বৃদ্ধির সামগ্রিক হার সব পেশা, শিল্প বা আয়ের শ্রেণির পরিস্থিতি আলাদাভাবে তুলে ধরে না। কোন খাতে মজুরি কতটা বেড়েছে, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও কাজের সময়ের পরিবর্তন কী ছিল এবং বিভিন্ন আয়ের মানুষের ব্যয় কীভাবে বদলেছে—এসব তথ্য ছাড়া সামগ্রিক চিত্র থেকে নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির পরিস্থিতি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
তবু বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যে মূল্যস্ফীতি এবং মজুরি বৃদ্ধির হারের ব্যবধান একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করছে। সেপ্টেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে উঠেছে, অথচ মজুরি বৃদ্ধির হার নেমে এসেছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশে। একই সঙ্গে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে আয় বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির সম্পর্ক এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে এই সূচকগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সাবকে নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে. মুজেরী মন্তব্য করেছেন, "মজুরি বৃদ্ধির হার দীর্ঘসময় ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকলে শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। এতে নিম্ন ও স্থির আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং তাদের ভোগক্ষমতা কমে যায়।"
তিনি বলেন, "এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু মজুরি বৃদ্ধির দিকে নজর দিলেই হবে না; কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগের গতি বাড়ানো এবং শ্রমের চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগে গতি না এলে মজুরি বৃদ্ধির ওপর চাপ সীমিত থাকতে পারে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন