প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভোলার নদী ও সাগরবেষ্টিত জেলায় গবাদি পশুর মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ বিভাগ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগের সফলতার জন্য পিপিআর রোগ নির্মূল ও ক্ষুরারোগ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া প্রকল্পের সফলতার দাবি করা হয়েছে। তবে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ বিভাগের মধ্যে তীব্র জনবল সংকট বিদ্যমান, যা এই খাতের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাত উপজেলার মধ্যে পাঁচটি উপজেলায় প্রাণিসম্পদ কার্যালয় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিবিদের অভাবে অত্যাধুনিক পরীক্ষাগার অচল হয়ে পড়েছে। এর ফলে কৃষকের গরু-মহিষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই খামারিরা জনবল বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন, যাতে মাঠপর্যায়ের সেবা নিশ্চিত করা যায়।
দীর্ঘদিন ধরে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের জেলা ও উপজেলা কার্যালয়গুলোতে জনবল সংকট চলমান রয়েছে। এই সংকটের মধ্য দিয়েই জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কার্যক্রম তিন ভাগের একভাগ জনবল নিয়ে চলছে।
এদিকে, সাত উপজেলার মধ্যে পাঁচটিতে উপজেলা কর্মকর্তা নেই। কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র সম্পূর্ণ কর্মীশূন্য হয়ে পড়ায় গবাদি পশুর উন্নত প্রজনন সেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারেও জনবল নেই। উপজেলা পর্যায়ে সাতটি কার্যালয়ের অর্ধেকের বেশি পদ খালি রয়েছে।
জেলায় গবাদি পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ ল্যাব থাকলেও সেখানে কোন পদ সৃষ্টি হয়নি। জনবল সংকটের কারণে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে সঠিক সময়ে পশুর চিকিৎসাসেবা ও পরামর্শ না পেয়ে ভোলার হাজার হাজার স্থানীয় খামারি ও প্রান্তিক গবাদি পশু পালনকারী দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১১টি পদের বিপরীতে জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন মাত্র চারজন। জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের ৯টি পদের সবই শূন্য। জেলা ভেটেনারি হাসপাতালের ছয়টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন চারজন। আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারের পাঁচটি পদে কোন জনবল নেই। তবে নেত্রকোনা থেকে প্রেষণে একজন কর্মকর্তা ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে পাঁচজন শ্রমিক হ্যাচারিটিতে কাজ করছেন।
সূত্র জানায়, জেলার সাত উপজেলার প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ৭৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৩৭ জন। এর মধ্যে সদর ও লালমোহন উপজেলা বাদে বাকি পাঁচটিতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নেই। ভেটেনারি সার্জন নেই দুইটি উপজেলায়। উপজেলা সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সাতটি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ড্রেসার ও অফিস সহায়কের সাতটি পদের সব কয়টি খালি রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গত পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে চরম জনবল সংকট বিদ্যমান বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রোগাক্রান্ত পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সংবলিত একটি ল্যাব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা থাকলেও সেখানে এখনো কোনো পদ সৃষ্টি হয়নি।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বাণিজ্যিক ও পারিবারিক ৭০৫টি খামারে পাঁচ লাখ ৯৫ হাজার গরু, ১৮৮টি মহিষের বাথানে এক লাখ ২৪ হাজার মহিষ, ২৮২টি খামারে দুই লাখ ৬৯ হাজার ছাগল, ১৫১টি খামারে ২১ হাজার ৩০৬টি ভেড়া পালন করা হয়। গরু ও মহিষ থেকে বছরে ১ দশমিক ৭৩ লাখ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদন ও এক দশমিক ২২৭ মেট্রিক টন মাংস উৎপাদিত হয়।
সূত্র জানায়, পিপিআর রোগ নির্মূল ও ক্ষুরারোগ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের আওতায় গত পাঁচ বছরে ৪২ লাখ ৬৩ হাজার প্রাণিকে ক্ষুরা রোগের টিকা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে পিপিআর রোগের টিকা দেওয়া হয়েছে প্রায় দুই লাখ প্রাণিকে। প্রকল্পের ৯ মাস বাকি থাকতে অর্জিত হয়েছে ৯০ ভাগ সফলতা। এতে প্রাণি মৃত্যুর হার কমে উৎপাদন বেড়েছে।
ভোলা সদর উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের গরুর খামারি মো. মাইনুদ্দিন জানান, তিনি গত ১৫ বছর ধরে গরুর খামারে গরু পালন করে আসছেন। কিন্তু প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে সরকারি কোনো সেবা ও ওষুধ পাননি। গরুর রোগ-বালাই হলে টাকা দিয়ে চিকিৎসক এনে চিকিৎসা করাতে হয়। গত বছর কয়েকটি ক্ষুরা রোগের ভ্যাকসিন পাওয়া গেছে।
সদর উপজেলার ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইংরোজ আলম টিমন বলেন, সরকার বিদেশে রোগমুক্ত মাংস রপ্তানির জন্য পিপিআর ও ক্ষুরারোগ মুক্ত করতে চার জেলাকে বাছাই করেছে। এর মধ্যে ভোলা অন্যতম। তবে, প্রাণিসম্পদ দপ্তরের জনবল সংকটের কারণে এ উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভোলা জেলায় ছয় লাখেরও বেশি গরু-মহিষ রয়েছে। সে তুলনায় অভিজ্ঞ চিকিৎসক নেই।
ইংরোজ আলম বলেন, বর্তমানে প্রত্যেক ইউনিয়নে একজন করে পশু বিশেষজ্ঞ সার্জন প্রয়োজন। অথচ উপজেলায় একজন সার্জনও নেই। ফলে গবাদিপশু পালনকারীরা বেশিরভাগ সময় পশুর যথাযথ চিকিৎসা করাতে পারছেন না।
ভোলায় প্রাণিসম্পদ খাতে সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে এবং খামারিদের বাঁচাতে দ্রুত শূন্য পদগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছেন এ খামারি।
জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. দীনেশ চন্দ্র মজুমদার জানান, এ হাসপাতালে সাতটি পদের মধ্যে তিনটি পদ খালি রয়েছে। এছাড়া প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় একটি ল্যাব দেওয়া হলেও সেখানে কোনো জনবল পদায়ন করা হয়নি।
জনবল সংকটের কারণে রোগ নির্ণয়, টিকাদান, জাত উন্নয়ন, কৃত্রিম প্রজননসহ নিয়মিত চিকিৎসা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তবুও তারা সেবা দিতে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পরিপূর্ণ জনবল দেওয়া হলে পূর্ণাঙ্গ সেবা প্রদান সম্ভব হবে।
ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম খাঁন কালের কণ্ঠকে বলেন, গবাদি পশু পালনে ভোলা একটি সম্ভাবনাময় জেলা। তাই সরকার ভোলাসহ চারটি জেলায় রোগমুক্ত মাংস উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে।
এ কর্মকর্তা বলেন, ভোলাকে পশুর রোগমুক্ত জেলা হিসেবে ঘোষণা করা গেলে এখানকার পশুর মাংস বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এতে কৃষক উপকৃত হবে। তবে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে অভিজ্ঞ জনবল প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রত্যেক উপজেলা কার্যালয়ে ১১টি করে পদ রয়েছে। এই পদ আরো বাড়ানোর প্রয়োজন। কিন্তু পদ যেখানে বাড়ানো দরকার, সেখানে জেলার সাত উপজেলায় বর্তমান পদের অর্ধেকের বেশি শূন্য রয়েছে।
জনবল সংকটে রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম ও চিকিৎসা কার্যক্রমের পাশাপাশি রোগ নিরাময়, সম্প্রসারণ এবং কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জনবলের বিকল্প নেই বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন