প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মোহামেদ আল ফায়েদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে প্রায় ৩০০ নারী ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৫ কোটি পাউন্ড দাবি করেছেন। বিলাসবহুল ডিপার্টমেন্ট স্টোর হ্যারডসের সাবেক মালিকের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। তবে হ্যারডসের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের জন্য যে অর্থ রাখা হয়েছে, তা এই পরিমাণের দ্বিগুণেরও বেশি।
যুক্তরাজ্যের আইন প্রতিষ্ঠান কেপি ল প্রায় ২৭৫ জন অভিযোগকারীর প্রতিনিধিত্ব করছে, যাদের অধিকাংশই হ্যারডসের সাবেক কর্মী। প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবী লুসি ট্রেনর জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে হ্যারডসের জন্য বরাদ্দকৃত ৬ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। মোট ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কমপক্ষে ১০ কোটি পাউন্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ কোটি পাউন্ড হতে পারে।
ট্রেনর আরও বলেন, প্রতিটি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই হিসাব করা হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্তদের হারানো আয় ও পেনশন, চিকিৎসার খরচসহ অন্যান্য ক্ষতির বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কেপি ল কর-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করেছে এবং কর্মসংস্থান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করেছে। তাঁরা সময়ের সঙ্গে নির্দিষ্ট পদগুলোর বেতন কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করেছেন।
হ্যারডসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ৬ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডের বরাদ্দ কোনো সর্বোচ্চ সীমা নয়, বরং এটি একটি আনুমানিক হিসাব। প্রতিটি ব্যক্তির দাবি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করে সেই অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দেওয়া হবে। এ বিশ্লেষণে হ্যারডসকে সহায়তা করেছে বাইরের আইনজীবী ও নিরীক্ষকেরা।
মুখপাত্র আরও বলেন, ‘নির্যাতনের শিকার সব যোগ্য ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে হ্যারডস প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ তাঁর ভাষ্য, ২৬০ জনের বেশি ব্যক্তি হ্যারডসের ক্ষতিপূরণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত ১১৩টি দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাঁদের আইনজীবীদের পছন্দের পদ্ধতিতে ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
বহু বছরের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ
মোহামেদ আল ফায়েদের বিরুদ্ধে বহু নারী ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির অভিযোগ করেছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর হ্যারডস যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। পরে হ্যারডস আল ফায়েদের চেয়ারম্যান থাকাকালে তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য ‘পরোক্ষ দায়’ বা ‘ভিকারিয়াস লায়াবিলিটি’ স্বীকার করে।
১৯৮৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত লন্ডনের হ্যারডসের মালিক ছিলেন মিশরীয় ধনকুবের আল ফায়েদ। ২০১০ সালে তাঁর পরিবার প্রতিষ্ঠানটি কাতারের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের কাছে বিক্রি করে দেয়। ২০২৩ সালে ৯৪ বছর বয়সে মারা যান আল ফায়েদ।
নারীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ বছরের পর বছর অস্বীকার করার পর ২০২৪ সালে হ্যারডস এক বিবৃতিতে জানায়, তারা অভিযোগগুলোতে ‘চরমভাবে হতবাক’ এবং ‘সঠিক কাজটি করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’।
এরপর ২০২৫ সালের মার্চে আল ফায়েদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা ব্যক্তিদের জন্য নিজস্ব ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি চালু করে হ্যারডস। প্রতিষ্ঠানটির দাবি ছিল, এ প্রস্তাব ভুক্তভোগীদের জন্য আকর্ষণীয়, কারণ এর আওতায় তাঁদের অতিরিক্ত আইনি খরচ দিতে হবে না। চলতি বছরের মার্চে নতুন করে দাবি গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়।
হ্যারডস জানিয়েছে, ৬ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডের বরাদ্দটি তাদের হিসাব অনুযায়ী সম্ভাব্য অর্থপ্রদানের পরিমাণ—তা হ্যারডসের নিজস্ব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হোক কিংবা নিজস্ব আইনজীবীর মাধ্যমে দাবি করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হোক।
হ্যারডসের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, জানুয়ারি পর্যন্ত দাবিদারদের ৪০ লাখ পাউন্ড পরিশোধ করা হয়েছে।
কারও ক্ষতিপূরণ পৌঁছাতে পারে ১০ লাখ পাউন্ডে। কর্মজীবন ও আয় হারানোর ক্ষতি নির্ধারণে বিশেষজ্ঞ ট্রেভর গিলবার্ট বলেন, কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট একটি ক্যারিয়ার গড়ার পথে ছিলেন, কিন্তু পরে তা চালিয়ে যেতে না পারলে তাঁর ক্ষতির পরিমাণ ১০ লাখ পাউন্ড হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এ ধরনের ক্ষতিপূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে খুব বেশি আয় করতেই হবে, এমন নয়।
তিনি বলেন, তার অভিজ্ঞতায় সাধারণত ক্ষতিপূরণপ্রার্থীরা তাঁদের দাবির সর্বোচ্চ সীমার দিকে মামলা এগিয়ে নেন, আর বিবাদীপক্ষ চেষ্টা করে সর্বনিম্ন সীমার দিকে রাখতে। পরে আলোচনা বা সমঝোতা বৈঠকের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়।
যৌন নির্যাতনের মামলায় বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জেমস কাউন্সেল বলেন, উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ক্ষতিপূরণ পাওয়া দাবিদারদের জন্য কঠিন হতে পারে। কারণ ইংল্যান্ডের আদালত ঐতিহাসিকভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিপূরণ দিয়ে এসেছে।
দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি
ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা তাঁদের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি চান। এদিকে হ্যারডস ও আল ফায়েদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির মধ্যে একটি আইনি বিরোধ চলছে। আল ফায়েদের পরিবারের সদস্যদের পরিবর্তে একজন স্বাধীন প্রশাসক নিয়োগের চেষ্টা করছে হ্যারডস।
হ্যারডস জানিয়েছে, ক্ষতিপূরণের ব্যয় বহনে সহায়তা করার জন্য তারা আল ফায়েদের সম্পত্তির কাছ থেকে অর্থ পাওয়ার চেষ্টা করছে। কেপি লকে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আইনি বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা আলোচনা করবে না। কেপি লর বেশির ভাগ মামলার দাবিদারই হ্যারডস ও আল ফায়েদের সম্পত্তি—দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে নভেম্বরে শুনানি হওয়ার কথা। ওই সময়ই বিচারক সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, আবার পরবর্তী সময়েও সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন।
হ্যারডসের মুখপাত্র বলেন, ‘নতুন ও স্বাধীন নির্বাহক নিয়োগ সব ভুক্তভোগীর স্বার্থে—শুধু একটি আইন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করা ব্যক্তিদের জন্য নয়, বরং সম্পত্তির বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দাবি থাকা সবার জন্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘হ্যারডস ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ পেতে বাধা দিচ্ছে—তাঁদের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে এমন কোনো পরামর্শ দেওয়া হলে তা বাস্তবতার ভুল উপস্থাপন এবং এই প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের আস্থার জন্য ক্ষতিকর।’
আল ফায়েদের সম্পত্তির প্রতিনিধিত্বকারী আইন প্রতিষ্ঠান কুইন ইমানুয়েল উরকহার্ট অ্যান্ড সুলিভান এলএলপির অংশীদার জাস্টিন মাইকেলসন বলেন, সম্পত্তির নির্বাহকেরা অভিযোগগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তবে আইনি কারণে এ বিষয়ে আর মন্তব্য করতে পারবেন না।
ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া যেভাবে দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তা দাবিদারদের জন্য ‘অত্যন্ত কষ্টদায়ক’ বলে মন্তব্য করেছেন কেপি লর আইনজীবী লুসি ট্রেনর।
কেপি ল যাঁদের প্রতিনিধিত্ব করছে, তাঁদের মধ্যে হ্যারডসের ফ্যাশন ক্রেতা, ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য নির্বাচিত ব্যক্তি এবং ব্যক্তিগত সহকারীরাও রয়েছেন। তাঁদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যকই কর্মজীবনের প্রথম দিকে ছিলেন। অভিযোগের কারণে তাঁদের কারও কারও ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু দাবিদারের ক্ষতির পরিমাণ কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে আইন প্রতিষ্ঠানটি। তবে ক্ষতিপূরণের অর্থ থেকে আইন প্রতিষ্ঠানটি একটি অংশ নেবে।
আল ফায়েদের বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের একজনের স্বামী কিটন স্টোন বলেন, ‘হ্যারডস গত দুই বছর ধরে বিশ্বকে বলে আসছে যে তারা ভুক্তভোগীদের পাশে আছে। কিন্তু নারীরা বাস্তবে যা দেখেছেন, তা হলো বিলম্ব। তাঁদের কেউ কেউ এরই মধ্যে ৩০ বা ৪০ বছর অপেক্ষা করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এখন সত্তরের কোঠায়।’
আল ফায়েদের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন স্টোন। তাঁর সেই অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই ২০২৪ সালে বিবিসিতে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রচারিত হয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন