প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘকালীন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমাত্রিক করার সম্ভাবনা নিয়ে আগামী ৩ থেকে ৫ নভেম্বর ঢাকা সফরে আসছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিক হিসেবে তাঁর এই সফরকে দুই দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অংশীদারিত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে দেখা হচ্ছে। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বৈঠক করবেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে লিউ হাইশিংয়ের পারিবারিক যোগসূত্রও দীর্ঘদিনের। তাঁর বাবা লিউ শুচিং ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮০ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেন। গত ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতের সময় লিউ হাইশিংয়ের এই পারিবারিক সংযোগ দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ঐতিহাসিক দিকটিও তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৪ নভেম্বর দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের ক্রিস্টাল হলে ‘হোয়্যার হিস্ট্রি ইলুমিনেটস দ্য ফিউচার: চায়না-বাংলাদেশ ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ প্লাস’ রাউন্ডটেবিল অ্যান্ড ইনাগুরেশন সেরিমনি অব বাংলাদেশ-চায়না সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজ’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এ আয়োজনে দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
১৯৬৩ সালের এপ্রিলে জন্ম নেওয়া লিউ হাইশিং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ১৯৮৫ সালে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ কূটনৈতিক জীবনে তিনি ফ্রান্সে চীনা দূতাবাস, জাতিসংঘে চীনের স্থায়ী মিশন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইউরোপবিষয়ক বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ইউরোপবিষয়ক বিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে কাজ করেন। বর্তমান দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি চীনের কেন্দ্রীয় জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের কার্যালয়ে নির্বাহী উপপরিচালক ছিলেন। ২০২৫ সালে তিনি সিপিসির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিভাগ বিদেশি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সঙ্গে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে লিউ হাইশিংয়ের সফরকে কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সফর হিসেবেই নয়, বরং দুই দেশের রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তিও লিউ হাইশিংয়ের সফরের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী পাঁচ দশকে বাণিজ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি, যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিস্তৃত হয়েছে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত সহযোগিতার অংশীদারত্বে উন্নীত হয়। ২০২৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ধারাবাহিকতাকে আরও দৃশ্যমান করে।
এ সম্পর্কের নতুন মাত্রা যুক্ত হয় ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের মধ্য দিয়ে। ওই সফরে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করা হয়। একই সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায় গঠনের লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ওই সফরে চীনা নেতৃত্বকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানান। ফলে লিউ হাইশিংয়ের বর্তমান সফর দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় নতুন গতি সঞ্চার করতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের অবস্থান বাংলাদেশের জন্য এ সম্পর্কের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, চীনের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ প্রায় ১৯ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যেখানে জাপানের জিডিপি প্রায় ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বর্তমান বাজারমূল্যে চীনের অর্থনীতি জাপানের তুলনায় চার গুণেরও বেশি বড়। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনকেন্দ্র, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং বিশাল ভোক্তাবাজার হিসেবে চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিজিএমইএ এবং ওভারসিজ চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশ এর যৌথ ফোরামের ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এই অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বাজার সম্প্রসারণে চীনের বিশাল ভোক্তাবাজার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। চীনা বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে শিল্পকারখানা, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগও রয়েছে।
এছাড়াও অর্থনীতিবিদদের মতে, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন, পরিবহন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে এসব সম্ভাবনার সুফল পেতে বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান গত ২৪ সেপ্টেম্বর চীনের গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৭৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্প এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ৩০ আগস্ট চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন গতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি চীনকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন। এসব বক্তব্য দুই দেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণে বাংলাদেশের আগ্রহের প্রতিফলন।
লিউ হাইশিংয়ের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নীতিনির্ধারণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিনিময়। নতুন বাংলাদেশ-চীন সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মাধ্যমে উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রশাসনিক দক্ষতা, দারিদ্র্য হ্রাস, শিল্পায়ন ও স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এ উদ্যোগ কার্যকর হলে দুই দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি বাণিজ্যঘাটতি কমানো, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগের সুফল দেশের অর্থনীতিতে ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। লিউ হাইশিংয়ের মতো উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধির সফর এসব বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লিউ হাইশিংয়ের ঢাকা সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার একটি সম্ভাবনাময় উপলক্ষ। রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে কার্যকর অর্থনৈতিক সহযোগিতায় রূপান্তর করা গেলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে পারে। দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, সমান মর্যাদা ও বাস্তব স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা সম্প্রসারণই হতে পারে এ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন