প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঈদ, বিশ্ব ইজতেমা, ভর্তি পরীক্ষা, বিভিন্ন উৎসব কিংবা বড় রাজনৈতিক সমাবেশের সময় ট্রেনে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের চিত্র বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দেখা যাচ্ছে। আসনসংকটের কারণে অনেক যাত্রী ট্রেনের ছাদে চড়ে ভ্রমণ করছেন, যা একদিকে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে, অন্যদিকে ট্রেনের ইঞ্জিন এবং কোচের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সদ্য শেষ হওয়া ঈদযাত্রায় রেলপথে অন্তত ৩১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৩ জন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এসব দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য অংশই ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সময় রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, ট্রেনের ছাদে যাত্রী বহনের কারণে যান্ত্রিক ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি পাচ্ছে, এর ফলে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাড়ছে এবং সেবার মান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বুধবার বাংলাদেশ রেলওয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত ‘ইনফরমেশন বুক’ অনুযায়ী, যাত্রী পরিবহনের জন্য মোট ২ হাজার ৬৪২টি কোচ রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৫২টি ব্রড গেজ এবং ১ হাজার ৪৯০টি মিটার গেজ লাইনের জন্য নির্ধারিত। তবে সব কোচ সচল নয়। ব্রড গেজ লাইনের মোট ৫৬১টি যাত্রীবাহী বগির মধ্যে ১৬২টি এখন অকেজো বা মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে সচল রয়েছে ৩৯৯টি বগি, যা মোট বগির ৭১ দশমিক ১২ শতাংশ। অন্যদিকে মিটার গেজ লাইনের মোট ১ হাজার ২৪৩টি বগির মধ্যে ২৪২টি অকেজো থাকলেও ১ হাজার ১টি বগি ব্যবহারের উপযোগী হয়ে আছে। এক্ষেত্রে প্রাপ্যতার হার ৮০ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সীমিতসংখ্যক সচল বগি দিয়েই প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে হয়। ঈদের মতো উৎসবের সময় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। তখন অনেক ট্রেনে ধারণক্ষমতার দুই-তিন গুণ বেশি যাত্রী ওঠেন। শুধু বগির ভেতর নয়, ছাদেও অবস্থান নেয় শত শত মানুষ।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীন গণমাধ্যমকে বলেন, রেলওয়ের বগিগুলো নির্দিষ্ট ওজন বহনের জন্য নকশা করা হয়েছে। কিন্তু ঈদের সময় যখন ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী ওঠেন, তখন ট্রেনের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত ওজনের কারণে ট্রেনের গতি কমিয়ে চালাতে হয়।
তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত চাপের ফলে বগির স্প্রিংগুলো পুরোপুরি বসে যায় এবং বিভিন্ন সেফটি আইটেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঈদের পর প্রতিটি বগি নতুন করে পরীক্ষা করতে হয়। এতে ট্রেনের আয়ু সরাসরি কমে না গেলেও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে যে মেরামত দুই মাস পর করার কথা, সেটি ১৫ দিনের মধ্যে করতেই হয়। ফলে নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ সূচি ব্যাহত হয়।’
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের মতে, পরিবহন, বাণিজ্যিক ও আইন-শৃঙ্খলা বিভাগ যৌথভাবে কাজ করলেও উৎসবমুখর সময়ে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে ট্রেনের নিরাপত্তা, সময়ানুবর্তিতা এবং যান্ত্রিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ শুধু বেআইনি নয়, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণও। ট্রেন কোনো বাঁক বা মোড় অতিক্রম করার সময় কেন্দ্রবিমুখী বলের কারণে ছাদে থাকা যাত্রীরা ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যেতে পারেন। এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে চালকদের গতি কমিয়ে ট্রেন চালাতে হয়।
তিনি আরো বলেন, অতিরিক্ত যাত্রীর ওজনের কারণে বিশেষ করে মিটার গেজ ট্রেনের সাসপেনশন স্প্রিংগুলো পুরোপুরি বসে যায়। তখন বগির বডি বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সঙ্গে ঘর্ষণে জড়িয়ে পড়ে। এতে যান্ত্রিক ক্ষতি হয় এবং অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ভেঙে যায়। ফলে সংশ্লিষ্ট বগিগুলো দ্রুত ওয়ার্কশপে পাঠাতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ বন্ধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, যাত্রী চাহিদার অনুযায়ী কোচ ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় প্রতি উৎসব মৌসুমেই একদিকে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবে, অন্যদিকে রেলওয়ের মূল্যবান রোলিং স্টকের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে এবং সেবার মান আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, রেলওয়ের বর্তমান সংকটের মূল কারণ হলো যাত্রী চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের সময়ে এ ব্যবধান আরো প্রকট হয়ে যায়। ঢাকায় কর্মসংস্থান এবং জীবিকার কারণে উত্তরাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে বসবাস করে। ঈদের ছুটিতে এদের বড় অংশ একসঙ্গে বাড়ি ফেরার জন্য এ রুটে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। তাই এ রুটে অতিরিক্ত ট্রেন, কোচ এবং লোকোমোটিভ সংযোজনের মাধ্যমে পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য রেলওয়ের নিজস্ব কোচ এবং লোকোমোটিভ বহর সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, নতুন সরকারের উচিত আগামী বাজেটে রেল পরিচালনা খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে এসব সরঞ্জাম সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দেয়া। তবে নতুন কোচ এবং লোকোমোটিভ সংগ্রহ এবং বহর সম্প্রসারণে সময় লাগবে। তাই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে উৎসব মৌসুমে প্রতিবেশী দেশ থেকে ব্রড গেজ কোচ বা লোকোমোটিভ ভাড়া বা লিজ নেয়ার উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে ঈদকেন্দ্রিক অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সামাল দেয়া সহজ হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণও কমানো সম্ভব হবে।
সূত্র : বণিক বার্তা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন