প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিস্তৃত অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে। নিয়োগ-পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য, টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন, এবং বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে ভিলা ও ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে আর্থিক অনিয়ম ও লেনদেনের যে পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে, তা প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। যুগান্তর দুদকের সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
সূত্র জানাচ্ছে, এর মধ্যে দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ সবচেয়ে বড়। বাকি অর্থের অভিযোগ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, বিভিন্ন পদে নিয়োগ, প্রকল্প, টেন্ডার এবং ঘুস লেনদেনের সঙ্গে জড়িত।
গত ২ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ বদলি, কেনাকাটা সিন্ডিকেটসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে অনুসন্ধানে। দুদক জানায়, নতুন অভিযোগটি আগের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে।
ডিসি পদায়নেও টাকার খেলা
দুদক জানাচ্ছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। একইভাবে সারা দেশে ৩৬ জন ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। ৩৬ জনের ক্ষেত্রে অভিযোগে উল্লেখিত সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ অঙ্কের সম্ভাব্য লেনদেনের পরিমাণ ৭২ কোটি থেকে ৩৬০ কোটি টাকা। বিষয়টি অনুসন্ধানে যাচাই করবে দুদক।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গেও আসিফ মাহমুদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
প্রকল্পে ১২০০ কোটি টাকা বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আবেদনে। ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের জন্য গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ওই প্রকল্পের বরাদ্দ ও অর্থ গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
১০ কোটি ঘুসে ওয়াসার এমডি নিয়োগ
ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য ১০ কোটি টাকা উৎকোচ নেওয়ার বিষয়টিও অনুসন্ধান করছে দুদক। এলজিইডির সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা ঘুসের বিনিময়ে নিয়োগ এবং ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সিইও হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতেও কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
বিদেশে ১১ হাজার কোটি
দুদক দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চার দেশে মোট অর্থপাচারের অভিযোগ ১১ হাজার কোটি টাকা। এসব অর্থ দিয়ে বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল ভিলা কেনা এবং ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগও করা হয়েছে।
দুদকে দেওয়া আবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের দুই বোনজামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে।
বাবা-এপিএস-পিওর বিরুদ্ধেও অভিযোগ
অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে। তার পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুস লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া হেলিকপ্টারে কম্বল বিতরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় এবং বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থানে গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে প্রবেশের ঘটনাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাশাপাশি পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব বিষয়েই অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।
আগের অনুসন্ধানে যা ছিল
এর আগেও আসিফ মাহমুদসহ সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
ওই অনুসন্ধানে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল ও পদায়নের মাধ্যমে ৭৬ লাখ টাকা, ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের জায়গায় পদায়নের জন্য ২ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের টেন্ডার, কেনাকাটা ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগের কথাও বলা হয়। চার সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিমকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এখন বড় পরিসরে অনুসন্ধান
নতুন অভিযোগে একাধিক মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ-পদায়ন এবং চার দেশে অর্থপাচারের অভিযোগ একসঙ্গে এসেছে। বিশেষ করে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের তথ্য থাকায় বিষয়টি বড় পরিসরে অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন