প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
শরতের রোদ এবং ভোরের হালকা কুয়াশা শীতের আগমনী বার্তা জানাচ্ছে। এই ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাঠজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন কর্মযজ্ঞ। কোথাও ধানখেতের বুক চিরে নতুন মাটির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও টমেটোর কোমল চারা রোপণের ধুম চলছে, আবার কোথাও সারি সারি ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা হাতছানি দিচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই বাজারের চড়া দাম ধরতে দিনরাত ঘাম ঝরাচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষকেরা।
তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর মাঠে ইঁদুরের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের মনে দানা বেঁধেছে গভীর শঙ্কা। চান্দিনার কৃষিতে এখন এক অদ্ভুত সমীকরণ—একদিকে আগাম সবজি তুলে বাজার মাতানোর সোনালি স্বপ্ন, অন্যদিকে অস্বাভাবিক ইঁদুর আতঙ্ক এবং বাড়তি খরচের কড়া ধাক্কা।
মৌসুমের শুরুতে বাজারে নতুন সবজির চাহিদা থাকে তুঙ্গে, দামও পাওয়া যায় দ্বিগুণ। এই সমীকরণকে পুঁজি করেই চান্দিনার মাঠের পর মাঠে শীতকালীন সবজি চাষের আয়োজন চলছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে চান্দিনায় ১ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে ৪৩ হাজার ৭৫৫ মেট্রিক টন শীতকালীন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই ৩১০ হেক্টর জমিতে আবাদের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাতাঘাসী, শুহিলপুর, মাধাইয়া, মহিচাইল, এতবারপুর, বাড়েরা, মাইজখার, চিলোড়া, এওয়াজবন্দ এবং পূর্ব অম্বরপুরের মাঠগুলো এখন যেন এক একটি সবজির ক্যানভাস।
কিন্তু কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, খেতে ভালো ফলন হওয়া মানেই শতভাগ সাফল্য নয়। দিনশেষে সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহন খরচ বাদ দিয়ে কৃষকের পকেটে কতটা থাকছে—তা-ই নির্ধারণ করে আসল লাভ-ক্ষতি।
উৎসবমুখর এই পরিবেশের মধ্যেই চান্দিনার কয়েকটি এলাকায় আমন ধানখেত এবং নতুন সবজি চারায় হানা দিয়েছে ইঁদুরের দল। চান্দিনা পৌরসভার তুলাতোলী, ছায়কোট, বড় গোবিন্দপুর এবং বাতাঘাসী ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে ইঁদুরের আক্রমণ অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। ধানগাছ ও শিষ কাটার পাশাপাশি কেটে ফেলা হচ্ছে ভুট্টা, শিম, বরবটি এবং বেগুনের কচিপাতা।
বাতাঘাসী ইউনিয়নের উত্তর কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক বাবুল মিয়া নিজের ৯০ শতক জমিতে এবার ভুট্টা চাষ করেছেন। খেতের অবস্থা বেশ চমৎকার হলেও তাঁর ঘুম হারাম করেছে ইঁদুরের উৎপাত।
তিনি বলেন "অন্যান্য বছর ইঁদুরের উপদ্রব কিছুটা কম থাকলেও এবার তা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। খেত বাঁচাতে নিয়মিত পাহারা দিচ্ছি, ফাঁদ পাতছি। কিন্তু কোনো কিছুতেই যেন ইঁদুর দমন করা যাচ্ছে না। ফসল কাটার আগে এভাবে ক্ষতি হতে থাকলে তো আসল খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়বে।"
অন্যদিকে, শ্রীমন্তপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম আগাম বাজারের আশায় শিম চাষ করলেও তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ। তাঁর মতে, গত বছরের তুলনায় এ বছর সার, ওষুধ এবং শ্রমিকের মজুরি যেমন বেশি, তেমনি ইঁদুরের অতিরিক্ত উপদ্রব কৃষকদের কোণঠাসা করে তুলেছে।
উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি এবং ইঁদুরের অস্বাভাবিক আক্রমণের মতো দ্বিমুখী সংকটের মাঝেও আশা হারাচ্ছেন না কৃষি কর্মকর্তারা।
চান্দিনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ মোরশেদ আলম জানান, আগাম শীতকালীন সবজি চাষ চাষিদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক। এর মাধ্যমে এ অঞ্চলের অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হচ্ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের ইঁদুর দমনসহ প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং তদারকি প্রদান করা হচ্ছে।
তবে কেবল মাঠপর্যায়ের পরামর্শেই সংকট পুরোপুরি কাটবে না বলে মনে করছেন অভিজ্ঞরা। তাঁদের মতে, কৃষকেরা যাতে সঠিক সময়ে ইঁদুর দমনের আধুনিক উপায় এবং হালনাগাদ বাজারদর সম্পর্কে জানতে পারেন, সে বিষয়ে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং সহযোগিতা প্রয়োজন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন