প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বয়স ৭৮ বছর। জীবনের প্রায় ৪৫ বছর কেটে গেছে বাঁশ, কাঠ, চামড়া আর দেশীয় বাদ্যযন্ত্র তৈরির কাজে। তার হাতেই তৈরি হয় একতারা, দোতারা, খমক, ঢোল, ডুগডুগি, খঞ্জনিসহ নানা ধরনের দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। একই সঙ্গে তৈরি করেন মাছ ধরার চাঁই, পলো, ঝুপড়া, বাঁশের মই, টেবিলসহ গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী।
কিন্তু যে হাত অন্যের ঘর সাজিয়েছে, শিল্পীর হাতে সুর তুলে দিয়েছে, সেই কারিগরের নিজের মাথা গোঁজার ঘরটিই আজ জরাজীর্ণ। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও অভাবের কারণে থামেনি তার কাজ। তিনি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার মাসকা ইউনিয়নের চকসাদক কোনাপাড়া গ্রামের আ. সাত্তার।
আ. সাত্তারের ছোট্ট বাড়ির আঙিনায় গড়ে ওঠা কর্মশালায় এখনও দেখা যায় দেশীয় বাদ্যযন্ত্র তৈরির সরঞ্জাম। আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি নেই। লোহার ফ্রেমে নিজের হাতে তৈরি একটি খোদাইযন্ত্রই তার প্রধান ভরসা। এক পাশে বসে তিনি কাঠে নকশা করেন, অন্য পাশে কাউকে দড়ি টেনে সহযোগিতা করতে হয়।
বয়সের কারণে এখন আগের মতো দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারেন না। একজন সহকারী রাখার প্রয়োজন হলেও সেই সামর্থ্য নেই। পরিচিত কেউ বাড়িতে এলে তখনই কিছুটা সহযোগিতা পান।
বাদ্যযন্ত্র তৈরির সূক্ষ্ম কাজে তিনি ব্যবহার করেন কুইজবাটাল, রাউন্ডবাটাল, সাফবাটাল, বিলসা, মাথিম, করাত, হাতুড়ি, ফিতা ও স্কেল। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় এসব সাধারণ সরঞ্জাম দিয়েই নিখুঁত কারুকাজ ফুটিয়ে তোলেন তিনি।
আ. সাত্তার জানান, একটি বিদ্যুৎচালিত খোদাইযন্ত্র থাকলে তার শারীরিক কষ্ট অনেকটাই কমত। পাশাপাশি দ্রুত কাজও করতে পারতেন। কিন্তু অভাবের সংসারে সেই যন্ত্র কেনার সামর্থ্য তার নেই।
তার তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য তাকে নিয়মিত হাটে যেতে হয় না। কাজের সুনাম থাকায় ক্রেতারা বাড়িতে এসে পণ্য কিনে নিয়ে যান। তবে কাঠ, বাঁশ, চামড়া ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়লেও তার তৈরি পণ্যের দাম সেভাবে বাড়েনি। ফলে দীর্ঘ শ্রমের তুলনায় ন্যায্য মূল্যও পান না তিনি।
সংসার চলে কীভাবে—এমন প্রশ্নের জবাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আ. সাত্তার বলেন, “একদম চলে না।”
চকসাদক কোনাপাড়া গ্রামেই জন্ম তার। বাবা সমর আলী ওরফে লাবু মিয়া এবং মা নাইবের মা অনেক আগেই মারা গেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ হয়নি তার। প্রায় ৪০-৪৫ বছর আগে উত্তর মাসকা গ্রামের কারিগর আবদুল জব্বারের কাছে কাজ শিখেছিলেন। তাকেই নিজের ওস্তাদ মনে করেন তিনি।
মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ জমিতে স্ত্রী, তিন ছেলে, ছেলের বউ ও নাতি-নাতনিসহ বড় পরিবারের বসবাস। তিন ছেলে মিস্ত্রির কাজ করেন। তবে তারা আলাদা থাকেন। দীর্ঘদিনের পুরোনো ঘরটি সংস্কার করার সামর্থ্যও নেই এই প্রবীণ কারিগরের।
শুধু কারিগর হিসেবেই নয়, একসময় বৈঠকি বাউল গানও করতেন আ. সাত্তার। বয়সের ভারে এখন আর গান গাইতে পারেন না। তবে তার হাতে তৈরি একতারা বা দোতারা নিয়ে যখন কোনো শিল্পী গান করেন, তখন আনন্দে ভরে ওঠে তার মন।
আ. সাত্তারের ভাষায়, “এসব দেশীয় পণ্য ও কারুশিল্প একসময় চিরতরে হারিয়ে যাবে। এগুলো এখন জাদুঘরে স্থান পাওয়ার যোগ্য।”
তার দীর্ঘ কর্মজীবনের নীরব সঙ্গী স্ত্রী মোছা. আবিয়া খাতুন। স্বামীর কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “সারাজীবন মানুষটা কষ্টই করল। থাকার মতো একটা ঘর পর্যন্ত নাই।”
তিনি সরকারের কাছে স্বামীর জন্য একটি নিরাপদ ঘর ও বিদ্যুৎচালিত খোদাইযন্ত্রের সহযোগিতা কামনা করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হাই, আবদুর রহমান ও মনিরুল ইসলামসহ অনেকেই বলেন, আ. সাত্তার তাদের এলাকার গর্ব। তার তৈরি বাদ্যযন্ত্র ও কারুশিল্প দেখতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তার শেষ জীবন যেমন স্বস্তিতে কাটবে, তেমনি বিলুপ্তপ্রায় এই কারুশিল্পও সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে কেন্দুয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইউনুস জামান রনি বলেন, “প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে আমাদের বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। খুব শিগগিরই আমরা আ. সাত্তারকে এসব প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসব।”
আ. সাত্তারের গল্প শুধু একজন প্রবীণ কারিগরের অভাব-অনটনের গল্প নয়। তার হাতের তৈরি বাদ্যযন্ত্রে আজও বেঁচে আছে গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্য। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের কারিগরই যখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিরাপদ একটি ঘরের অভাবে থাকেন, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই শিল্প ও শিল্পীদের টিকিয়ে রাখতে আমাদের দায়িত্ব কতটুকু?
একটি নিরাপদ ঘর, কাজের উপযোগী আধুনিক যন্ত্র এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে হয়তো স্বস্তি ফিরবে ৭৮ বছরের এই কারিগরের জীবনে। একই সঙ্গে তার হাত ধরে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারে বাংলার হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় কারুশিল্পের ঐতিহ্য।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন