প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হানো পেভকুর পদত্যাগ করেছেন, কারণ সাত কোটি ইউরোর বেশি মূল্যের গোলাবারুদ কেনার চুক্তি বড় ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।
চুক্তিটি ভারতের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত হয়েছিল, যার পূর্বে কামানের গোলা বিক্রির অভিজ্ঞতা ছিল না। গোলাবারুদ সরবরাহে দেরি হওয়া এবং সরবরাহ করা গোলাবারুদের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর, ২০২২ সাল থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসা পেভকুর বুধবার তার পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
জাতীয় নিরীক্ষা দপ্তরের একাধিক সমালোচনামূলক প্রতিবেদনের পর তিনি প্রতিরক্ষা চুক্তির রাজনৈতিক দায় নিজের কাঁধে নিতে চান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পেভকুর উল্লেখ করেন, "এস্তোনিয়ার নিরাপত্তা কোনো একজনের দায়িত্ব নয়। এটি সবার যৌথ দায়িত্ব।" তিনি জানান, উপযুক্ত সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন।
এই ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালে, যখন এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ কেন্দ্র ইতালিতে নিবন্ধিত দাতাসেল এসআরএল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোলাবারুদ কেনার চুক্তি করে।
চুক্তির কিছুদিন আগে ভারতের মালিকানাধীন নেকো ডিফেন্স মিউনিশনস দাতাসেলকে অধিগ্রহণ করে। ইউক্রেনের জন্য কামানের গোলা সংগ্রহ করাই ছিল চুক্তির মূল উদ্দেশ্য।
এসময় ইউক্রেন তীব্র গোলাবারুদ সংকটে ভুগছিল। এস্তোনিয়ার সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ইআরআর এবং দেশটির সংবাদপত্র এসতি এক্সপ্রেস ও পোস্টিমিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোলাবারুদ কেনার অর্থের একটি অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোপীয় শান্তি তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছিল।
এস্তোনিয়া চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটিকে কয়েক দফায় অগ্রিম অর্থ দেয়। পরে অগ্রিম দেওয়া অর্থের মোট পরিমাণ প্রায় সাত কোটি ইউরোতে পৌঁছায়। ২০২৪ সালের আগস্টে প্রথম চুক্তির সময় প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ ইউরো অগ্রিম দেওয়া হয়। একই বছরের অক্টোবরে দ্বিতীয় চুক্তিতে আরো এক কোটি ইউরোর বেশি দেওয়া হয়। বছরের শেষ নাগাদ আরো কয়েকটি চুক্তি হয়। সব মিলিয়ে অগ্রিম দেওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭ কোটি ইউরোতে পৌঁছে যায়।
প্রথমে কয়েক মাসের মধ্যে ইউক্রেনে গোলাবারুদ পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উৎপাদনসংক্রান্ত সমস্যার কারণে সরবরাহ বারবার পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালে কিছু গোলাবারুদ সরবরাহ করা হয়। তবে এসতি এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব গোলাবারুদ নির্ধারিত মানের শর্ত পূরণ করতে পারেনি।
গোলাবারুদ কেনার এই চুক্তির সঙ্গে জড়িত দাতাসেল দাবি করেছে, চুক্তি বাতিলের আগে তারা এস্তোনিয়াকে পাঁচ কোটি ৯০ লাখ ইউরো মূল্যের গোলাবারুদ সরবরাহ করেছে। চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এস্তোনিয়া সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক সালিশেও গড়িয়েছে।
আইনজীবীর মাধ্যমে এসতি এক্সপ্রেসকে দাতাসেল জানিয়েছে, এই চুক্তির কারণে তাদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চুক্তি বাতিলের জন্য এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ কেন্দ্র যে কারণ দেখিয়েছে, সেগুলো পরস্পরবিরোধী এবং যুক্তিহীন।
দাতাসেল আরো জানিয়েছে, এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ কেন্দ্র তাদের মোট পাঁচ কোটি ৯০ লাখ ইউরো অগ্রিম দিয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে করা চুক্তির মোট মূল্য ছিল প্রায় সাত কোটি ইউরো। এ কারণে বাকি অর্থ কোথায় গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এসতি এক্সপ্রেস। তবে পত্রিকাটি জানিয়েছে, অর্থটির বিষয়ে এখনো পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি।
দাতাসেলের দাবি, তারা বিপুল পরিমাণ পণ্য সরবরাহ করেছে এবং মোট পাঁচ কোটি ৮০ লাখ ইউরোর চালান জমা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সরবরাহে দেরি হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। তবে গোলাবারুদের মান খারাপ ছিল- এই অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছে। দাতাসেল জানিয়েছে, পরে তাদের জানানো হয়, এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ কেন্দ্র বাকি পণ্য আর গ্রহণ করতে পারবে না।
তবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ কেন্দ্র যদি নিজেদের দায়িত্ব পালন করত, তাহলে তারা এখনো চুক্তিটি শেষ করতে প্রস্তুত ছিল।
গত শরতে এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ কেন্দ্র দাতাসেলের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো বাতিল করে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কাছে আগে দেওয়া অর্থ ফেরত চাওয়া হয়। এরপর এস্তোনিয়া বিষয়টি ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে অবস্থিত ইউরোপীয় সালিস ও মধ্যস্থতা কেন্দ্রে নিয়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিরোধ মেটানোর এই ব্যবস্থার মাধ্যমে এস্তোনিয়া প্রায় সাত কোটি ইউরোর অর্থ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছে।
এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ কেন্দ্রের মহাপরিচালক এলমার ভাহের বলেছেন, দাতাসেলের সঙ্গে এ চুক্তি করা উচিত হয়নি। তিনি বলেন, "কোনো প্রতিষ্ঠান আগে কখনো একটি বাড়ি না বানালে তাকে দিয়ে বাড়ি বানানোর কাজ করানো হলে সেটি শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।" তার মতে, দাতাসেলের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকি ছিল। পেভকুরের পদত্যাগের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো এস্তোনিয়ার জাতীয় নিরীক্ষা দপ্তরের সমালোচনা।
প্রতিরক্ষা তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং সামরিক সরঞ্জাম কেনার প্রক্রিয়া নিয়ে দপ্তরটি একাধিকবার প্রশ্ন তুলেছে। ইআরআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ আগস্ট প্রকাশিত একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থ ব্যবহারের পদ্ধতি এবং সম্পদের হিসাব রাখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা হয়। এর আগেও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছিল নিরীক্ষা দপ্তর।
দপ্তরটি সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থ ফেরত পাওয়া না গেলে শেষ পর্যন্ত এস্তোনিয়াকে নিজস্ব বাজেট থেকে প্রায় সাত কোটি ইউরো পরিশোধ করতে হতে পারে। তবে পেভকুর বলেছেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি সামরিক সরঞ্জাম কেনার চুক্তি দেখভাল করেন না।
তিনি বলেন, "একজন মন্ত্রী প্রতিটি সরঞ্জাম বা গোলাবারুদ গুনে দেখেন না এবং প্রতিটি চুক্তি নিয়ে সরাসরি আলোচনা করেন না।" তবে জাতীয় নিরীক্ষা দপ্তরের সমালোচনা প্রতিরক্ষা বাহিনী ও প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ কেন্দ্রের কর্মকাণ্ড নিয়ে হওয়ায় রাজনৈতিক দায়ের প্রশ্ন উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থ নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধের বিষয়ে এস্তোনিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে ইউরোপীয় কমিশন।
কমিশনের মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান উইগান্ড বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের করদাতাদের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য কমিশনের বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজনে অর্থ ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টেন মিখাল এর আগে বলেছিলেন, গোলাবারুদ কেনার ঘটনায় পেভকুর ব্যক্তিগতভাবে দোষী- এমন কিছু তিনি দেখছেন না। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে রাজনৈতিক দায় তার ওপর বর্তাতে পারে বলে স্বীকার করেছিলেন তিনি। পেভকুর বলেন, এস্তোনিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে সরকার যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছে, সেগুলো সঠিক ছিল- এই বিশ্বাস থেকেই তিনি পদত্যাগ করছেন।
তিনি আরো বলেন, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ হামলা শুরুর পর এস্তোনিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যয় অনেক বেড়েছে। ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে পেভকুর দাবি করেন, এস্তোনিয়া আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি নিরাপদ। ইউক্রেনকে সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপরও জোর দেন তিনি। তার মতে, ইউক্রেনকে সহায়তা করা মানে এস্তোনিয়ার নিজের নিরাপত্তায়ও অবদান রাখা।
প্রায় ১২ লাখ মানুষের দেশ এস্তোনিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্য। দেশটির সঙ্গে রাশিয়ার স্থলসীমান্ত রয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে এস্তোনিয়া ও বাল্টিক অঞ্চলের অন্যান্য দেশ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে। রাশিয়ার সামরিক কর্মকাণ্ডকে তারা সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে। এস্তোনিয়া ইউক্রেনের অন্যতম শক্তিশালী ইউরোপীয় সমর্থক। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে সামরিক ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে আসছে দেশটি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন