প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাঁধ মেরামত, নদী তীর সংরক্ষণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার জোরালো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ।
তিনি জানিয়েছেন, জরুরি নদী তীর রক্ষা এবং বাঁধ সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ৭ লাখের বেশি জিওব্যাগ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া, মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব মজুদে আরও ৬ লাখ জিওব্যাগ প্রস্তুত রয়েছে।
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ের তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা-সম্পর্কিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জানান, এবার দেশের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ১ হাজার ৫০০টিরও বেশি জরুরি কাজের প্যাকেজ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্যাকেজ স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০০টি প্যাকেজের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রায় ১ হাজার প্যাকেজের কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, আগামী দিনগুলোতে যদি ভারী বৃষ্টিপাত বা নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাহলে এসব জিওব্যাগ এবং অন্যান্য জরুরি সরঞ্জাম ব্যবহার করে দ্রুত নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং বাঁধ রক্ষার কাজ করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু তাৎক্ষণিক দুর্যোগ মোকাবিলা নয়, দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধানের দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। জলাবদ্ধতা নিরসন, নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ শক্তিশালীকরণ, সুইস গেট আধুনিকায়ন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ফলে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিভাগে গত এক সপ্তাহে অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টিপাতের ফলেই ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ।
তিনি জানান, দেশের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিমিটার হলেও গত ৬ থেকে ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বিভাগেই রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই অতিবৃষ্টির কারণেই চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার, বান্দরবানে ১ হাজার ১০২ মিলিমিটার, এবং কক্সবাজারে ৮৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দেশের একটি বিশেষ বিভাগে এত স্বল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা। ফলে পাহাড়ি ঢল, জলাবদ্ধতা এবং পরে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি জানান, গত ১২ জুলাই তিনি নিজে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক (ডিজি) চট্টগ্রামে গিয়ে সরেজমিনে বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। এই সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা হয়।
ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, পরিদর্শনের সময় বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের চলমান কোনো প্রকল্পের কারণে কোথাও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে কি না।
তিনি জানান, চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে গেছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রকল্পটি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজার জেলার কয়েকটি এলাকা। বিশেষ করে জেলার চারটি স্থানে বাঁধ এবং পোল্ডারে ক্ষতি হয়েছে। কক্সবাজারের মাতারবাড়ী-সংলগ্ন নতুন উপজেলা এলাকায় পুরাতনখালী এবং পূর্বপাড়ায় পানি প্রবাহের তীব্র চাপে বাঁধে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, কক্সবাজারের পূর্ব মেহেরনামা এলাকাতেও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বাঁধের ভেতরে অতিরিক্ত পানি জমে যাওয়ার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা পানি নিষ্কাশনের জন্য কয়েকটি স্থানে নিজেরাই বাঁধ কেটে দিয়েছেন। শিলখালী এলাকাতেও একই কারণে বাঁধ কেটে পানি বের করে দেওয়া হয়েছে।
ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, এসব ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ দ্রুত পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি সুইস গেটগুলো সংস্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে পানি নিষ্কাশন আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়, সে উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত দেশের কয়েকটি নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) এবং মারকুলি (সুনামগঞ্জ) স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা নদীর ছাতক স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ৬ সেন্টিমিটার এবং নেত্রকোণার কমলাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানি ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তানদীর পানি বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে।
তবে আশার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৃষ্টিপাত কমে আসায় দেশের অধিকাংশ নদীর পানি ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর পানিও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে দ্রুত মেরামত এবং পুনর্নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, প্রতি বছরেই বন্যা মৌসুম শুরু হওয়ার আগে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকে। তবে চলতি বছর সম্ভাব্য অতিবৃষ্টির বিষয়ে বিবেচনা নিয়ে আগের তুলনায় আরো বিস্তৃত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আবহাওয়ার উন্নতি অব্যাহত থাকলে দেশের বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। একই সঙ্গে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় দেশের সব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রাখবে এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন