প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আজ ২৩ অক্টোবর। বাংলা সাহিত্যের শক্তিশালী কবি শামসুর রাহমানের ৯৮তম জন্মদিন উদযাপন করা হচ্ছে। ১৯২৯ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার মাহুতটুলীর নানাবাড়িতে তার জন্ম হয়। ডাকনাম ছিল ‘বাচ্চু’।
বাংলা কবিতার আকাশে তিনি একটি দীপ্তিমান নক্ষত্র, যিনি মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন এবং স্বৈরাচারবিরোধী গণজাগরণের প্রতিটি স্তরে আলো ছড়িয়েছেন। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে তার সাবলীল লেখনী বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
শামসুর রাহমানের কবিতায় বাঙালির স্বাধীনতা প্রাপ্তির চেতনার দীপ্তস্বর উচ্চারিত হয়েছে, তবে তিনি মৌলবাদবিরোধিতায় ছিলেন সোচ্চার। ধর্মান্ধতাকে তিনি আজীবন ঘৃণা করেছেন। প্রেম, দ্রোহ ও বিশ্বজনীনতা নিয়ে অসংখ্য চিরায়ত কবিতা রচনা করেছেন, যা আজও সকল বয়সের মানুষের মধ্যে উজ্জীবন সৃষ্টি করে। কবিতা রচনায় স্বাধীনতার কণ্ঠকে ধারণ করার জন্য তাকে বাংলা কবিতায় স্বাধীনতার কবি হিসেবে পরিচিতি দেওয়া হয়।
সৃষ্টি ও মননের দ্যুতিময় উপস্থাপনার জন্য তিনি সমকালীন বাংলা কবিতার প্রধান কবির মর্যাদা অর্জন করেছেন। দুই বাংলায় তিনি সমান জনপ্রিয় ছিলেন এবং নাগরিক কবি হিসেবেও পরিচিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর তার লেখা দুটি কবিতা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকের পাঁচ বিশিষ্ট কবির পর আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষ হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়।
শামসুর রাহমানের জন্ম ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকার মাহুতটুলীর নানাবাড়িতে। তার পৈতৃক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরার পাড়াতলী গ্রামে অবস্থিত। ১৯৫৭ সালে তিনি একজন সংবাদকর্মী হিসেবে দৈনিক মর্নিং নিউজ পত্রিকায় কর্মজীবন শুরু করেন।
১৯৫৭ সালে রেডিও পাকিস্তানে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালে তিনি আবার মর্নিং নিউজে ফিরে আসেন এবং ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।
১৯৬৪ সালের শেষের দিকে তিনি দৈনিক পাকিস্তানে সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ওই পত্রিকাটি দৈনিক বাংলা নামে প্রকাশিত হয়। ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে সামরিক সরকারের শাসনামলে তিনি দৈনিক বাংলা থেকে পদত্যাগ করেন এবং পরবর্তীতে সাহিত্য পত্রিকা অধুনার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৪৯ সালে সোনার বাংলা পত্রিকায় শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় সম্পাদকীয় ও উপ-সম্পাদকীয় লেখায় ছদ্মনাম হিসেবে সিন্দাবাদ, চক্ষুষ্মান, লিপিকার, নেপথ্যে, জনান্তিকে, মৈনাক ব্যবহার করেছেন। তিনি একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেও পরিচিত। তৎকালীন সরকারি পত্রিকায় কাজ করার পরেও তিনি আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রূপ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারাভোগের সময় তাকে উদ্দেশ্য করে কবিতা লিখেছেন।
রবীন্দ্রসংগীতের ওপর পাকিস্তান সরকারের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে তিনি সোচ্চার ছিলেন। তার লেখা ‘বর্ণমালা’, ‘আমার দুখিনী বর্ণমালা’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ এই কবিতাগুলো বিদ্রোহী চেতনার প্রকাশ ঘটায়।
১৯৮৭ সালে স্বৈরশাসন আমলে তিনি পর পর ৪ বছর ধরে ‘শৃঙ্খল মুক্তির কবিতা’, ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা,’ ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিতা’ এবং ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কবিতা’ লেখেন।
শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়। কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিশুতোষ রচনাসহ তার শতাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে।
সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক, জীবনানন্দ পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমেদ স্মৃতি পুরস্কার, সাংবাদিকতার জন্য মিৎসুবিশি পুরস্কার, স্বাধীনতা পদক ও আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কবিকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধি দেওয়া হয়।
শামসুর রাহমান নামটির সঙ্গে বাংলাদেশ ও এদেশের কবিতাপ্রেমীদের এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ তিনি আমাদের স্বাধীনতার কবি। মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কারণে শ্যামলীর নিজ বাড়িতে তাকে কৃষ্ণপক্ষের শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হতে হয়েছিল।
কবি শামসুর রাহমান ছিলেন মৃদুভাষী। কিন্তু যেকোনো আন্দোলনে, অধিকার আদায়ের দাবিতে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার লেখনী তো ছিলই, তিনি সশরীরেও এসব আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতেন। তার কবিতা মানুষের মুখে মুখে মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হয়ে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ, মৌলবাদ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার কবিতা মানুষকে উজ্জীবিত করেছে এবং প্রেরণা জুগিয়েছে।
২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন