প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজশাহীর তানোরে কৃষিপণ্যর দরপতনে কৃষকরা দুঃখের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ও চরম সংকটের মুখোমুখি। তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনের পরদিন পরিশ্রম করে উৎপাদন করা কৃষিপণ্যগুলো এখন সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থার অভাবে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। ফলে প্রতি মুহূর্তে তারা একের পর এক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। অবগত সূত্রে জানা গেছে, আলুর পর এবার আমের দরপতন ঘটেছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে দাম কম থাকায় কৃষকদের হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকে ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমনও কিছু আছে যারা শেষ সম্বলটুকু হারিয়েছে। নতুন খবর হচ্ছে, এনজিও ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারার কারণে কিছু কৃষক এলাকায় চলে গেছে।
এদিকে, তানোরে আলুর জমিতে রোপণ করা বোরো ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে। তবে মাঠের নতুন ধানের পাশাপাশি গাছে পাকা আম ঝুললেও কৃষকদের মুখে হাসি নেই। ধান ও আমের দাম বাজারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। উৎপাদন খরচ তুলতে পারার শঙ্কায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এখন ধান প্রতি মণ (৪০ কেজি) বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। কৃষকদের দাবি, বর্তমান উৎপাদন খরচের সাথে এ দাম কোনোভাবেই অপার্যाप्त নয়।
উপজেলার কলমা ইউনিয়নের (ইউপি) বিল্লী গ্রামের কৃষক সারোয়ার জাহান চলতি মৌসুমে ২০ বিঘা জমিতে ব্রি-৭৬ জাতের বোরো ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, “মঙ্গলবার আমি ধান কেটে মাড়াই সম্পন্ন করে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রির জন্য যাই। কিন্তু কেউ কেনার আগ্রহ দেখায়নি। শেষে একজন ব্যবসায়ী ৮০০ টাকা মণ দরে কিনতে রাজি হয়।” তিনি জানালেন, এ দামে ধান বিক্রি করলে উৎপাদন খরচও উঠবে না। বরং তার এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা লোকসান হবে।
তানোর, গোদাগাড়ী, মোহনপুর, পবা ও নওগাঁর মান্দা উপজেলার হাজারো কৃষকও উপঢৌকনে একই অবস্থায়। তারা বলছেন, সেচ, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচ বাড়ায় ধানের উৎপাদনের ব্যয়ও বেড়েছে। অথচ তারা বর্তমানে বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে চরম আর্থিক সংকটে পড়ছেন।
অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও রাজশাহী বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদনকারী অঞ্চল হলেও বর্তমান মৌসুমে আমের বাজারে ভয়াবহ দরপতন ঘটেছে। চাষিরা অভিযোগ করেন, গত এক দশকের মধ্যে এবার আমের দাম সবচেয়ে কম। বাজারে ক্রেতার অভাব থাকার কারণে অনেক বাগানে পাকা আম গাছেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন জাতের আম প্রতি কেজি ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে কৃষকরা জানাচ্ছেন, যদি চলতি মৌসুমে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তাহলে অনেক বাগান মালিক বড় ধরনের লোকসানের মুখোমুখি হয়ে পড়বেন।
তানোর পৌরসভার কালীগঞ্জহাট মহল্লার কৃষক রনি চলতি মৌসুমে ৩০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। বর্তমানে তার আলু হিমাগারে সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি বলেন, “এখন প্রতি কেজি আলু মাত্র সাড়ে ১৭ টাকা। অথচ উৎপাদন খরচ ও হিমাগার ভাড়া মিলে আমার প্রতি কেজিতে খরচ হয়েছে প্রায় ২৪ টাকা। দাম না বাড়লে আমার প্রায় ২০ লাখ টাকা লোকসান হবে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরও আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে বহু কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অনেকেই ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে আর্থিক সংকটে পড়েছেন। চলতি বছরেও একই পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, পেঁয়াজ ও রসুন চাষেও হতাশা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় এবং রসুন বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। কৃষকদের দাবি, এ দামে উৎপাদন খরচ উঠানো সম্ভব নয়।
তানোর উপজেলার পাঁচন্দর গ্রামের দুই রসুন চাষি সাদেক ও তার সহযোগীরা জানান, গত বছর দুই বিঘা জমিতে তারা রসুন চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছিলেন। এবারও দুই বিঘা জমিতে রসুন চাষ করেছেন, তবে বাজারমূল্য কম থাকার কারণে তারা রসুন বিক্রি না করে বাড়িতে সংরক্ষণ করছেন। তারা জানান, “গত বছরের মতো এবারো দাম না পেলে আমরা আগামীতে আর রসুন চাষ করবো না।”
স্থানীয় কৃষকগণ রসুন উৎপাদন করলেও বিদেশি রসুন আমদানির কারণে তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। রসুন চাষিদের মতে, দেশে উৎপাদিত রসুন দিয়েই অভ্যন্তরীণ চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু আমদানি নির্ভর নীতির কারণে স্থানীয় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষকদের অভিযোগ, একটির পর এক ফসল কার্যকর লোকসান হচ্ছে বলে তারা ব্যাংক ক্লোজিংয়ের কারণে ধান ক্রয়ে ধীরগতি অবলম্বন করছেন। এর ফলে বাজারে ধানের চাহিদা কমে যাচ্ছে এবং দাম নিম্নমুখী হচ্ছে। তাদের দাবী, জুলাই মাস থেকে ধানের বাজারে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে কৃষকেরা বলছেন, প্রতি বছর একই ধরনের অজুহাত দেখানোর মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হচ্ছে না। কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মন্তব্য করছেন, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রয়োজন। বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকারি ক্রয় এবং আমদানি নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা প্রয়োজন। কৃষকদের মত অনুযায়ী, তাদের যদি ধারাবাহিকভাবে লোকসানের মুখে পড়তে থাকে তাহলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন কমে যেতে পারে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ হাজার ১৯০ হেক্টর, যা গতবারের চেয়ে ১২০০ হেক্টর কম। গত মৌসুমে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩ হাজার ১১৫ হেক্টর। দামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানালেন, তাদের কাজ হচ্ছে চাষাবাদে রোগ বালাই আছে কি না এবং রোগ বালাই হলে দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দামের বিষয় কৃষি বিপণন বিভাগের কাজ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তানোরে চলতি মৌসুমে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ হাজার ২০০ হেক্টর, কিন্তু চাষাবাদ হয়েছে ১৪ হাজার ১৩০ হেক্টর, ৭০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়নি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন