প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতের বড় বড় মেট্রো শহরের সীমানা অতিক্রম করে এবার জেলা ও মফস্বল শহরগুলোতে ব্যাপকভাবে প্রসারিত হচ্ছে বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা। বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলোর বিপুল পুঁজির মাধ্যমে ভারতের ছোট ও মাঝারি শহরগুলোর স্বাস্থ্যসেবা খাতে একটি বিশাল পরিবর্তন ঘটছে। ব্ল্যাকস্টোন, কেকেআর, টিপিজি এবং জেনারেল আটলান্টিকের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গত ৫ বছরে ভারতের স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৮৪,০০০ কোটি রুপি) বিনিয়োগ করেছে। এই বিপুল অর্থের মাধ্যমে বেসরকারি হাসপাতালগুলো এখন ছোট শহরগুলোতে তাদের নেটওয়ার্ক ও বেড সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি করছে।
ব্ল্যাকস্টোনের অর্থায়নে পরিচালিত ‘অ্যাস্টার ডিএম কোয়ালিটি কেয়ারে'র চিফ এক্সিকিউটিভ বরুণ খান্না মন্তব্য করেছেন, ‘মানুষের মধ্যে একটা ভুল ধারণা ছিল, ছোট শহরগুলোতে হাসপাতাল চালানো লাভজনক বা টেকসই নয়।’ বর্তমানে তার কোম্পানির অধীনে ভারতজুড়ে ৩৯টি হাসপাতাল এবং ১০ হাজারের বেশি বেড রয়েছে।
চারটি হাসপাতাল ব্র্যান্ডের একীভূতকরণের (মার্জার) মাধ্যমে এই চেইনটি গঠিত হয়েছিল, যার মধ্যে কিছু ব্র্যান্ড ব্ল্যাকস্টোন ২০২৩ সালে অধিগ্রহণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি আগামী ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে তাদের বেডের সংখ্যা আরো ৫ হাজার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, যার মূল ফোকাস থাকবে চিকিৎসা ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা বা অনুন্নত অঞ্চলগুলোর ওপর।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে খান্না জানান, ‘ভারতের শহরগুলো পশ্চিমা দেশগুলোর শহরের মতো নয়। ভারতের একটি ছোট শহরের জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখের কাছাকাছি। আপনি যদি অস্ট্রেলিয়ার একটি বড় শহর এবং আমার দেশের একটি তৃতীয় স্তরের শহরের দিকে তাকান, দেখবেন আমাদের জনসংখ্যা এবং স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা একই।’
ভারত সরকার জিডিপির মাত্র ১.৫ শতাংশেরও কম স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০২৫ সালের মধ্যে এই খরচ বাড়িয়ে ২.৫ শতাংশ করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার পর থেকে এই স্তরের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। গত আগস্ট মাসে একটি সংসদীয় কমিটির রিপোর্টে এই সরকারি বরাদ্দকে ‘অপর্যাপ্ত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
ভারতের সরকারি হাসপাতাল নেটওয়ার্ক মূলত বিনামূল্যে এবং ব্যাপক ভর্তুকিতে চলে, তবে এর মান সব জায়গায় এক রকম নয়। অনেক হাসপাতালই জরাজীর্ণ, জনাকীর্ণ এবং চিকিৎসা কর্মী ও সরঞ্জামের তীব্র ঘাটতি রয়েছে—বিশেষ করে গ্রামীণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ ভারতীয় বাস করেন।
অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথকেয়ার প্রোভাইডার্স ইন্ডিয়া'র তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটিতে বর্তমানে আনুমানিক ২৪ লাখ হাসপাতাল শয্যার ঘাটতি রয়েছে।
সরকারি ব্যবস্থার এই বিশাল ঘাটতির কারণেই মানুষ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করছে। কারণ, সাধারণ মানুষের ধারণা বেসরকারি হাসপাতালগুলো উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসা দেয় এবং সেখানে অপেক্ষার সময়ও কম। ফলে ভারতের মোট হাসপাতালে ভর্তির প্রায় ৬০ শতাংশ এবং আউটডোর (বহির্বিভাগ) সেবার ৭০ শতাংশই সামলায় বেসরকারি খাত।
পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়ার ভাইস-প্রেসিডেন্ট প্রীতি কুমার বলেন, ‘এখন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। মানুষ এখন ইক্যুইটি, ক্যাপিটাল গেইন, লাভ-ক্ষতি এবং মার্কেট শেয়ারের মতো পরিভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে, যা ২০ বছর আগেও আমাদের শব্দভাণ্ডার থেকে একেবারেই অনুপস্থিত ছিল।’
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াই-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রাইভেট ইকুইটি এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এই খাতের চুক্তি বা ডিলগুলোর মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে এই খাতে ১৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াই-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে ভারতের স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের এক বিশাল জোয়ার এসেছে; যেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা প্রাইভেট ইক্যুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ১৪.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে।
ব্ল্যাকস্টোন, কেকেআর এবং কার্লাইলের মতো বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতের হাসপাতাল, নার্সিং হোম এবং ডায়াগনস্টিক মোটা অংকের বিনিয়োগ করছে। দশকের পর দশক ধরে অন্যান্য দেশে তারা যে বিনিয়োগ কৌশল খাটিয়ে এসেছে, এখন সেটিই তারা ভারতে প্রয়োগ করছে।
কেকেআরের এখন পর্যন্ত হওয়া সবচেয়ে বড় ক্রয়ের একটি হল—গত আগস্ট মাসে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের ‘মেডিকভার ইন্ডিয়া’র প্রায় ৫ হাজার বেডের হাসপাতালটি কিনে নেয়।
২৬টি হাসপাতাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘কৃষ্ণা ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা বল্লিনেনী ভাস্কর রাও এই খাতের বৃদ্ধির পেছনে ভারতের প্রবীণ বা বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক রোগের প্রকোপ এবং মানুষের ভালো চিকিৎসার খরচ বহন করার ক্ষমতা বেড়ে যাওয়াকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রাও বলেন, ‘রোগের ধরণ বা প্রকোপ বেড়েছে, মানুষের খরচ করার ক্ষমতাও বেড়েছে। ফলে এই খাতে প্রচুর টাকা আসছে।’
চলতি বছর বিএসই হসপিটাল ইনডেক্স মাত্র ১.৬ শতাংশ কমেছে, যেখানে মূল শেয়ার বাজার সূচক ‘বিএসই সেনসেক্স’ একই সময়ে ১৫ শতাংশ পড়ে গিয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের অন্যতম বৃহত্তম হাসপাতাল গ্রুপ ‘মণিপাল হেলথ এন্টারপ্রাইজেস’ গত আগস্টে আইপিও-র মাধ্যমে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার তোলার পর থেকে তাদের শেয়ারের দাম ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মুম্বাই-ভিত্তিক ল ফার্ম জেএসএ-র পার্টনার মিনহাজ লোকহ্যান্ডওয়ালা, যিনি এই চিকিৎসা খাতের বেশ কিছু বড় ডিল নিয়ে কাজ করেছেন, তিনি জানান, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি যে স্বাস্থ্যসেবা খাতটি বিনিয়োগকারীদের জন্য অন্য সব খাতের চেয়ে ভালো রেভিনিউ করছে এবং এটি ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে। আমি এটি থামার কোনো লক্ষণ দেখছি না, কারণ এই বাজারে এখনো বিস্তারের বিশাল সুযোগ বাকি রয়েছে।’
ভারতের রেটিং এজেন্সি ইকরা অনুমান করেছে, ১৮টি প্রধান হাসপাতাল চেইন আগামী চার বছরে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন রুপি (৪.৬ বিলিয়ন ডলার) খরচ করবে এবং ৩৪ হাজারের বেশি নতুন বেড যুক্ত করবে। এই নতুন ক্ষমতার প্রায় ৪০ শতাংশই তৈরি করা হবে দেশের ছোট শহরগুলোতে।
বিএনপি পারিবাস ভারতের স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রধান অ্যানালিস্ট তৌসিফ শেখ বলেন, ‘এই কাহিনীর পরবর্তী ধাপটি গড়ে উঠবে দেশের ছোট শহরগুলোতে।’
এই বিস্তারের একটি আদর্শ উদাহরণ হলো ভারতের মূল ভূখণ্ডের একদম দক্ষিণ প্রান্তের কাছাকাছি নাগেরকয়েল নামক একটি ছোট শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত ‘অ্যাস্টার’-এর হাসপাতালটি। হ্রদ এবং সবুজ পাহাড়ে ঘেরা ২১০ বেডের এই আধুনিক হাসপাতালটি দুই বছর আগে চালু করা হয়েছিল, যা সেখানকার কয়েক লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীরা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের আর প্রায় ৫০ মাইল দূরে উত্তরের বড় শহর তিরুবনন্তপুরমে যেতে হচ্ছে না, যা তারা খুবই ইতিবাচকভাবে দেখছেন। কারণ সড়কপথে ওই পথটুকু যেতে আগে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লাগতো।
বরুণ খান্না বলেন, ‘এই দূরপাল্লার যাতায়াত এড়াতে পারায় রোগীদের অর্থনৈতিক হিসাবটাই বদলে গিয়েছে। কারণ আগে স্থানীয় সুবিধা না থাকায় চিকিৎসার চেয়ে তাদের যাতায়াত এবং হোটেলের পেছনেই বেশি টাকা খরচ হয়ে যেত।’
তবে সতর্ক করে দিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্যকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। ভারতের সাধারণ পরিবারগুলোকে তাদের চিকিৎসা খরচের প্রায় ৪০ শতাংশ নিজেদের পকেট থেকে দিতে হয় এবং এশিয়ার মধ্যে ভারতেই চিকিৎসা ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি (খরচ বৃদ্ধি) সবচেয়ে বেশি, যা বছরে প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ।
এই বিষয়টি এখন নতুন দিল্লির (কেন্দ্রীয় সরকারের) কড়া নজরদারিতে এসেছে। গত আগস্টে প্রকাশিত সংসদীয় কমিটির রিপোর্ট অনুসারে, বেসরকারি হাসপাতালে রোগীদের থাকার গড় খরচ যেখানে ৫৩০ ডলার, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানে তা মাত্র ৭০ ডলার।
কমিটি বেসরকারি খাতের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতার তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে, ডায়াগনস্টিকস, চিকিৎসা সামগ্রী, ওষুধ এবং আইসিইউ -র জন্য বেসরকারি হাসপাতালের ‘অনিয়ন্ত্রিত খরচ’ সাধারণ ও অসহায় পরিবারগুলোকে ঋণের জালে জর্জরিত করে ফেলছে।
কমিটি বিদেশি বিনিয়োগ এবং হেলথকেয়ার চেইনগুলোর ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপের সুপারিশ করেছে। তাদের মতে, এর ফলে চিকিৎসার খরচ আকাশচুম্বী হচ্ছে এবং পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপরই দাম বাড়ানোর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তবে চিকিৎসা খাতের নির্বাহীদের যুক্তি হলো, ভারতের সরকারি অর্থায়নের যে বিশাল ঘাটতি রয়েছে, তাতে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর না করাটা অবাস্তব।
ভারতের একটি বৈশ্বিক প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ডের প্রধান (যিনি এই খাতে বিনিয়োগ করেছেন এবং নাম প্রকাশ না করার শর্তে) বলেন, ‘ভারতে স্বাস্থ্যসেবা একটি বিশাল এবং অপূরণীয় মানবীয় চাহিদা। কেবল সরকারি খরচ দিয়ে এই বিশাল শূন্যতা পূরণ করা অসম্ভব। তাই এই ঘাটতি মেটাতে ও পরিকাঠামো তৈরি করতে বেসরকারি পুঁজি এগিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন