প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইন্দা-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) মহাপরিচালক শত্রুজিৎ কাপুরের সাম্প্রতিক একটি প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি কেন্দ্র সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তে একাধিক স্থানে ভারতীয় সেনাবাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে, যা ধারণা করা হচ্ছে চীনা বাহিনীর সঙ্গেই ঘটছে।
সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি নিয়ে এটিই প্রথম সরকারি মন্তব্য বা স্বীকারোক্তি। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো মাসের পর মাস ধরে এই পরিস্থিতি তুলে ধরলেও সরকার এতদিন ধরে এসব দাবি অস্বীকার করে আসছিল।
‘দ্য অরুণাচল টাইমস’-এর সাংবাদিক বেঙ্গিয়া আজুমের একটি ভিডিও প্রতিবেদনে অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরি জেলার ট্যাকসিং গ্রামের পঞ্চায়েত নেতা প্রকাশ হরিকে কথা বলতে দেখা যায়। ওই ভিডিওটি গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হয় এবং হরি জানান যে, অরুণাচলে চীনা অনুপ্রবেশের বিষয়টি নিয়ে “দীর্ঘদিন ধরে” আলোচনা চলছে।
হরি বলেন, “গত এক বা দুই মাসে আপনারা এই বিষয়ে জানতে পেরেছেন, প্রেস ব্রিফিং হয়েছে এবং মিডিয়া বিষয়টি খেয়াল করেছে। আমরা এই নিয়ে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সাথে একাধিকবার কথা বলেছি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।”
ভিডিওতে বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান যে, পাত্রাং হ্রদের কাছে চীনাদের উপস্থিতি রয়েছে। হরি আরও উল্লেখ করেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘শেরা ৫’ পাসের কাছের চারণভূমিগুলোতে চীনা সেনাবাহিনীর চলাচল দেখা গেছে, যা স্থানীয় জনজীবনকে প্রভাবিত করছে।
জমির বাস্তবতা থেকে পাওয়া এসব তথ্য এবং আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি স্বীকার করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ উঠছে। চলতি বছরের জুনে, ‘নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ অভিযোগ করেছিল যে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) ট্যাকসিংয়ের কাছে তাদের উপস্থিতি সম্প্রসারিত করেছে।
‘অরুণাচল২৪’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি আপার সুবানসিরির ডেপুটি কমিশনারের কাছে একটি বিস্তারিত স্মারকলিপি জমা দিয়েছিল। সেখানে তারা অভিযোগ করে যে, চীনা বাহিনী একাধিক স্থানে রাস্তা, সেতু এবং সামরিক ক্যাম্প স্থাপন করেছে, যা স্থানীয় জনগণের ঐতিহ্যগতভাবে গবাদি পশুর চারণভূমি, শিকার এবং বনজ সম্পদ সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত হত। স্মারকলিপি অনুসারে, এই কার্যকলাপগুলো গত ১০ থেকে ১৫ বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে ২০২০ সালের পর থেকে তা আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।
চলতি বছরের আগস্টে ‘দ্য ওয়ার’ অরুণাচল টাইমসের বরাতে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য গঠিত একটি তথ্যসন্ধানী কমিটির বরাত দিয়ে জানানো হয়, চীনা পিএলএ সদস্যরা ট্যাকসিং এলাকার গুরুত্বপূর্ণ টহল পয়েন্টগুলোতে ভারতীয় বাহিনীর প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) বরাবর ভারতীয়দের চারণভূমি ও শিকারের এলাকার ওপর চীনারা তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে।
পিপলস পার্টি অব অরুণাচল (পিপিএ) চার সদস্যের এই তথ্যসন্ধানী কমিটি গঠন করেছিল, যার মধ্যে ছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী কাহফা বেঙ্গিয়া, পিপিএ সহ-সভাপতি কালিং জেরং এবং সম্পাদক সোরাং কিওকাম ও নরাহ জিমি।
পূর্বে বিজেপি সরকারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আর. কে. সিং প্রধানমন্ত্রী মোদিকে উদ্দেশ্যে করে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, ২০১৪ সাল থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী কতগুলো টহল পয়েন্ট "ছেড়ে দিয়েছে"—সে বিষয়ে যেন মোদি মুখ খোলেন। ভিডিও প্রতিবেদনে পঞ্চায়েত নেতার উল্লেখিত ‘শেরা ৫’ পয়েন্টের কথা আর. কে. সিং-ও তুলে ধরেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, “মনে হচ্ছে আমরা অরুণাচলের ট্যাকসিংয়ের ‘শেরা ৫’ নামের টহল পয়েন্টটি ত্যাগ করেছি এবং চীনারা সেখানে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।”
তবে আগস্ট মাসেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু চীনা সৈন্যরা অরুণাচল প্রদেশের ভেতরে ৬০ কিলোমিটার ঢুকে পড়েছে—এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে সীমান্তের উঁচু শৈলশিরাগুলোতে চীনা সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় গ্রামবাসীদের প্রকাশ করা উদ্বেগ যৌক্তিক এবং তা গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত উল্লেখ করে রিজিজু বলেছিলেন, “আমাদের লোকেরা বিশ্বাস করে আমাদের জমি আরও সামনের দিকে বিস্তৃত, অন্যদিকে চীনের দিকের গ্রামগুলো (তিব্বতি ও স্থানীয় বাসিন্দারা) দাবি করে তাদের জমি আমাদের ভেতরে ঢুকে গেছে। ফলে একটি বিভ্রান্তি রয়ে গেছে।”
অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীও চীনা অনুপ্রবেশের রিপোর্টগুলো ভিত্তিহীন বলে খারিজ করে দিয়েছিল। সরকারি দাবির বিপরীত চিত্র তুলে ধরে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের সীমানার ভেতরে ‘ওয়াচা-দামাই’ বর্ডার মিটিং পয়েন্টে চলমান সীমান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য কর্পস কমান্ডার স্তরের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই এলাকার এলএসি পরিস্থিতি সামাল দিতে দুই দেশের স্থানীয় কমান্ডারদের মধ্যে একাধিক বৈঠকের পরই এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “উভয় পক্ষই বিদ্যমান কূটনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থা ব্যবহার করে অমিমাংসিত সমস্যাগুলো সমাধান করতে এবং নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর ভুল বোঝাবুঝি বা ভুল হিসাব এড়াতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।”
জোরালো হচ্ছে সমালোচনা
চলতি বছরের আগস্টে লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেছিলেন যে, চীন ভারতকে অরুণাচল প্রদেশে টহল দিতে বাধা দিচ্ছে—যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ সহযোগীরা এই বিষয়ে কী করছেন তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
একটি কংগ্রেস অনুষ্ঠানে রাহুল গান্ধী অভিযোগ করে বলেন, “আপনারা কি জানেন কী ঘটছে? মোদিজির কার্যালয় থেকেই তথ্য আসছে। চীনে আমাদের নিজস্ব এলাকায় টহল দিতে বাধা দিচ্ছে। রাজনাথ সিং, অমিত শাহ এবং নরেন্দ্র মোদি নিজেদের সামলাতে পারছেন না। তারা কী করছেন? তারা মিডিয়া এডিটরদের ফোন করে এই খবর চেপে রাখার চেষ্টা করছেন।”
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মোদি সরকার চীনকে অনেক “ক্লিন চিট” দিয়েছে এবং এখন “প্রধানমন্ত্রী মোদির উচিত দেশের মানুষের কাছে সত্য তুলে ধরা।” সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে খাড়গে বলেন, অরুণাচল প্রদেশে মুখোমুখি অবস্থানের বিষয়টি আইটিবিপি প্রধানের মুখে নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে মন্তব্য করেছেন, “যে বাহিনীর সীমান্তে পাহারা দেওয়ার কথা ছিল, তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে দেশের নাগরিকদের প্রতিবাদ থামাতে। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন।” এছাড়া ভোজপুরি গায়িকা নেহা সিং রাঠোর তাঁর একটি নতুন ব্যঙ্গাত্মক গানে বিষয়টিকে তুলে ধরে সুর তুলেছেন—“পাহারাদার আজ চীনকে ভয় পাচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন