প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
১৪তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারী সাইফুল সার্ভেয়ারের জমি কেনা ও পাঁচতলা ভবন নির্মাণে সম্ভাব্য বিনিয়োগ ৪ কোটি ৬৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার বেশি। এর বাইরে নকশা অনুমোদন, ড্রিলিং বা পাইলিং, বিদ্যুৎ সংযোগসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ রয়েছে। ফলে তাঁর বিনিয়োগের অর্থের উৎস এবং সরকারি চাকরির আয়-সঞ্চয়ের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে জনস্বার্থে প্রশ্ন উঠেছে।
মাসিক বেতন-ভাতা সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা ধরে ২০ বছরে একজন কর্মচারীর মোট আয় হয় ৭২ লাখ টাকা। এই আয় থেকে নিজের ভরণপোষণ, স্ত্রী-সন্তানের খরচ, মা-বাবার দেখাশোনা, সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য পারিবারিক ব্যয় মেটানোর পর কত টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। তবে সাইফুল সার্ভেয়ারের প্রকৃত চাকরির মেয়াদ, বেতন বৃদ্ধি, ভাতা ও অন্যান্য বৈধ আয় যাচাই না করে এই হিসাবকে তাঁর প্রকৃত মোট আয় বলা যাবে না।
একটি সূত্রের দাবি, সাইফুল সার্ভেয়ার বর্তমানে পিরোজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি শাখায় কর্মরত রয়েছেন। তবে তাঁর বর্তমান কর্মস্থলের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি চাকরিতে থেকে বৈধ উপার্জনে সম্পদ অর্জন দোষের নয়। তবে এত বড় বিনিয়োগের অর্থ কোথা থেকে এসেছে, তা জানা জরুরি। প্রশ্ন তাই—সরকারি চাকরি কি ‘আলাদিনের চেরাগ’, নাকি এই সম্পদ গড়ার পেছনে রয়েছে অন্য কোনো বৈধ আয়ের উৎস?
গতকাল বরিশাল নগরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে জমির দখল নিয়ে সাইফুল সার্ভেয়ার ও এক প্রতিবেশীর মধ্যে বিরোধের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার একটি ভিডিও তালাশ বিডিতে প্রকাশ করা হয়। ভিডিও প্রকাশের পর সাইফুল সার্ভেয়ারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাঁর বক্তব্য নেওয়া হয়।
সাইফুল তালাশ বিডিকে জানান, গত বছর তিনি নিজের নামে ৬ শতাংশ জমি কিনেছেন। প্রতি শতাংশের দাম দিয়েছেন ১৭ লাখ টাকা। সে হিসাবে জমির ক্রয়মূল্য ১ কোটি ২ লাখ টাকা। নিবন্ধন খরচ বাবদ ব্যয় হয়েছে ১৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা। অর্থাৎ জমি কেনা ও নিবন্ধন মিলিয়ে মোট ব্যয় ১ কোটি ১৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
জমিটিতে পাঁচতলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন সাইফুল সার্ভেয়ার। ভবন নির্মাণের জন্য সিটি করপোরেশন থেকে অনুমোদিত নকশা নিয়েছেন বলেও জানা গেছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজে সম্ভাব্য ব্যয় সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত নির্মাণব্যয়ের বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বাড়ি নির্মাণে প্রতি বর্গফুটে আনুমানিক ২ হাজার ৮৫০ থেকে ৩ হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে পাইলিং, ফাউন্ডেশন, নির্মাণসামগ্রীর মান, শ্রমিকের মজুরি, বৈদ্যুতিক ও অন্যান্য স্থাপনা যুক্ত হলে ব্যয় আরও বাড়তে পারে। তবে এগুলো সাধারণ বাজারভিত্তিক অনুমান; বরিশালের এই নির্দিষ্ট ভবনের প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণে অনুমোদিত নকশা, মোট নির্মিত আয়তন, নির্মাণসামগ্রীর বিবরণ ও ঠিকাদারের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
জমি কেনা ও নিবন্ধনের ১ কোটি ১৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার সঙ্গে ভবন নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয় সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি যোগ করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ কোটি ৬৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার বেশি। এর বাইরে নকশা অনুমোদন, ড্রিলিং বা পাইলিং, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ যুক্ত হতে পারে। তবে এসব খাতে প্রকৃত ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য হিসাব ও নথি পাওয়া যায়নি। তাই মোট বিনিয়োগ সাড়ে ৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো নেই।
সাইফুল সার্ভেয়ার তালাশ বিডিকে বলেছেন, নিজের পরিশ্রমের উপার্জিত অর্থ দিয়ে জমি কিনেছেন এবং ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি পারিবারিক বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদের কথা উল্লেখ করেননি।
তাঁর বক্তব্যের সত্যতা ও বিনিয়োগের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য নির্ধারণে প্রকৃত বেতন-ভাতা, অন্যান্য বৈধ আয়ের উৎস, সঞ্চয় এবং পারিবারিক ব্যয়ের হিসাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। জমির দলিল, নিবন্ধন রসিদ, আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব ও ভবন নির্মাণের ব্যয়ের নথি যাচাই করলে বিনিয়োগের অর্থের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশে ভূমি অফিসকে ঘিরে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জমির নামজারি, রেকর্ড সংশোধন, মাপজোক ও সীমানা নির্ধারণসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এসব কাজে সার্ভেয়ারদের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তাঁদের ভূমিকা ও আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতাও আলোচনায় আসে।
তবে ভূমি অফিসকে ঘিরে সাধারণ অভিযোগ থাকা মানেই কোনো নির্দিষ্ট কর্মচারী দুর্নীতিতে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সাইফুল সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে ঘুষ বা অবৈধ আয়ের অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে নির্দিষ্ট নথি, সাক্ষ্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। তাঁর সম্পদের উৎস নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তরও নিরপেক্ষ যাচাইয়ের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।
তালাশ বিডির পক্ষ থেকে সাইফুল সার্ভেয়ারের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে এবং তাঁর বক্তব্যের রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে তাঁর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপেও যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত তাঁর লিখিত জবাব পাওয়া যায়নি। প্রাসঙ্গিক নথি ও ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
এ বিষয়ে বরিশাল জেলা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক কর্মকর্তা তালাশ বিডিকে জানান, “অবৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে আপনারা সংবাদ প্রকাশ করুন। একজন নাগরিক হিসেবে জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিন। আমরা অভিযোগটি যথাযথভাবে যাচাই করে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তাঁকে আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব।”
সাইফুল সার্ভেয়ারের বিনিয়োগের অর্থের উৎস নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিষ্পত্তি নির্ভর করবে নির্ভরযোগ্য নথি যাচাই ও যথাযথ তদন্তের ওপর। তালাশ বিডি প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যের ভিত্তিতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়টি পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছে।
সাইফুল সার্ভেয়ারের অনুসন্ধানীর প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব দেখতে তালাশ বিডির সাথেই থাকুন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন