প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
লালমনিরহাট, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ : শহরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দৃশ্যমান স্থানে পর্যাপ্ত গণ শৌচাগার নির্মাণের জন্য লালমনিরহাটের বাসিন্দারা আহ্বান জানিয়েছেন। বাসসের সঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা শহরবাসীর দুর্ভোগ তুলে ধরতে গিয়ে প্রশাসনের কাছে এই আবেদন করেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, লালমনিরহাট শহরে গণশৌচাগারের অভাবে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রয়োজনের সময় শৌচাগারের অভাবে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। পৌরসভা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মিত ১৪টি গণশৌচাগারের অধিকাংশই তালাবদ্ধ, পরিত্যক্ত অথবা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান শৌচাগার সংস্কার, নতুন স্থাপনা নির্মাণ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ, ঈদগাহ মাঠ এবং সরকারি স্থাপনার ভেতরে কিছু শৌচাগার থাকলেও সেগুলো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত নয়। রাস্তার পাশে থাকা কয়েকটি শৌচাগারও তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। সচল কিছু শৌচাগার থাকলেও সেগুলো ব্যবহার উপযোগী নয়।
জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ৯টি ওয়ার্ডের লালমনিরহাট পৌরসভার আয়তন ১৭ দশমিক ৯৫ বর্গকিলোমিটার। ২০০৫ সালে পৌরসভাটি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হয়। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, পৌরসভার জনসংখ্যা ৬৭ হাজার ৩৫৫ জন। একই জনশুমারি অনুযায়ী, সদর উপজেলার জনসংখ্যা ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৪৬৩ জন। এর মধ্যে ৯১ হাজার ৩৭১ জন বা ২৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ নগর এলাকায় বসবাস করেন।
সূত্র অনুযায়ী, লালমনিরহাট পৌরসভা ও সদর এলাকার প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭২৬ জন মানুষ শহরকেন্দ্রিক নাগরিক সেবা গ্রহণ করে। এছাড়া জেলার পাঁচ উপজেলার মানুষ চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, আদালত এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কাজে প্রতিদিন জেলা শহরে আসেন। জেলার মোট জনসংখ্যা ১৪ লাখ ২৮ হাজার ৪০৬ জন। ফলে শহরের বিদ্যমান নাগরিক সেবার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
সদর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) ও পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, শহরে নির্মিত ১৪টি গণশৌচাগারের মধ্যে ডিপিএইচইর নয়টি এবং পৌরসভার পাঁচটি।
ডিপিএইচইর নির্মিত নয়টি গণশৌচাগারের মধ্যে চারটি নির্দিষ্ট স্থাপনার ভেতরে, দুইটি তালাবদ্ধ এবং তিনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এসব শৌচাগারের কোনো পরিচালনাকারী নেই। এগুলো বিডিআর হাট, কালেক্টরেট মাঠ, স্মৃতিসৌধের পাশে, মার্কস মসজিদের ভেতরে, শহীদ শাহজান কলোনি, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, রেলওয়ে মুক্তমঞ্চের পাশে, চার্চ অব গড গির্জার পাশে এবং নয়ারহাট বাজারে অবস্থিত। অন্যদিকে, পৌরসভা দ্বারা নির্মিত পাঁচটি গণশৌচাগারের মধ্যে দুইটি তালাবদ্ধ, একটি উন্মুক্ত এবং দুইটি পরিত্যক্ত রয়েছে।
পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আখতারুজ্জামান বাবু বাসসকে বলেন, "গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে গণ শৌচাগার না থাকায় নারী-পুরুষদের বিপাকে পড়তে হয়, যা মানুষের জন্য স্বাস্থ্যহানিকর।"
পাটগ্রাম থেকে জেলা জজ আদালতে সেবা নিতে আসা হাফিজুর রহমান বলেন, "শহরের দৃশ্যমান স্থানে গণ শৌচাগার না থাকায় প্রয়োজনের সময় বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।"
বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষমান বেলি বেগম জানান, "বাসস্ট্যান্ডে একটি শৌচাগার থাকলেও সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত একজনের বাসায় গিয়ে শৌচাগার ব্যবহার করতে হয়েছে। যারা শিশুদের নিয়ে শহরে আসেন, শৌচাগারের অভাবে তাদেরও চরম সমস্যায় পড়তে হয়।"
তিনি আরও বলেন, "বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য দৃশ্যমান, নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য গণ শৌচাগার থাকা জরুরি।"
পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আলমগীর হক বলেন, "প্রয়োজনীয় স্থানে নতুন গণ শৌচাগার নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান শৌচাগারগুলো সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিচালনাকারী নিয়োগ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।"
শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম সাদেকী বাসসকে বলেন, "বিশেষ করে নারীদের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহারযোগ্য গণশৌচাগারের সংকট রয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও জনসমাগমস্থলে দৃশ্যমান ও পর্যাপ্ত গণ শৌচাগার নির্মাণ করা প্রয়োজন।"
লালমনিরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আবু-আল-হাজ্জাজ বাসসকে বলেন, "পর্যাপ্ত গণ শৌচাগার না থাকায় সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পুরোনো শৌচাগার সংস্কারের পাশাপাশি নতুন শৌচাগার নির্মাণ করা উচিত।"
তিনি আরও বলেন, "দীর্ঘ সময় প্রস্রাব বা পায়খানা আটকে রাখলে মূত্রনালির সংক্রমণসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান স্থানে পর্যাপ্ত গণ শৌচাগার নির্মাণ জরুরি।"
লালমনিরহাট পৌরসভার কর্মকর্তা ও শহর পরিকল্পনাবিদ এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামান তালুকদার জানান, "এ বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাজেট দিলেই কাজ শুরু করা হবে।"
লালমনিরহাট সদরের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. বাদশাহ্ আলমগীর বাসসকে বলেন, "তারা শৌচাগার নির্মাণ করে স্থানীয়দের দায়িত্বে দিয়ে দেন। হয়তো এ কারণেই সেগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হয় না। বর্তমানে নতুন শৌচাগার নির্মাণের কোনো প্রকল্প নেই। নতুন করে প্রস্তাব দিতে হবে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
লালমনিরহাট পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা হরানন্দ রায় বলেন, "পৌর এলাকার গণ শৌচাগার সংকট সমাধানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পরিকল্পনা প্রস্তাব দিতে বলেছেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে দ্রুত স্থান নির্ধারণ করে কিছুদিনের মধ্যেই বাস্তবায়ন কাজ শুরু করা হবে।"
সংশ্লিষ্টদের মতে, গণ শৌচাগার সংকট সমাধানে শুধু নতুন স্থাপনা নির্মাণ যথেষ্ট নয়। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, হাসপাতাল, আদালত এবং জনসমাগমস্থলে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন শৌচাগার নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান স্থাপনাগুলো সংস্কার করে চালু করতে হবে। প্রতিটি শৌচাগারে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, নির্দিষ্ট পরিচালনাকারী এবং তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নারী, শিশু, বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী নকশা, নিরাপদ প্রবেশ পথ এবং হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে গণ শৌচাগারগুলো সচল রাখা গেলে জনদুর্ভোগ কমার পাশাপাশি শহরের পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন