প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিশ্ব খাদ্য দিবসে প্রশ্নটি শুধুমাত্র পেট ভরানোর বিষয় নয়, বরং আমরা কী খাচ্ছি এবং সেই খাবার সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কতটুকু, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছোটবেলায় ঐকিক নিয়ম শিখেছিলাম। এক কেজি চালের দাম জানা থাকলে দুই কেজির দাম কত, তা সহজেই বের করা যায়। একটি জানা তথ্য থেকে অজানা হিসাব বের করার এই সহজ নিয়মটি তখন পরীক্ষার খাতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। বড় হয়ে বুঝতে পারছি, জীবনের অনেক জটিল প্রশ্নের উত্তরও কখনো কখনো এমন সহজ হিসাবের মধ্যে লুকিয়ে থাকে।
ধরা যাক, একটি খাবারে কতটা চিনি, লবণ বা চর্বি রয়েছে, তা সহজেই জানা গেল। সেই তথ্যের ভিত্তিতে খাবারটির পুষ্টিগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেল। আর কেনার মুহূর্তে ভোক্তা যদি তথ্যটি বুঝতে পারেন, তাহলে কি খাবার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত আরও সচেতন হতে পারে না? এই ভাবনা থেকেই ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং বা এফওপিএল-এর প্রয়োজনীয়তা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, যেখানে প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কের সামনের অংশে সহজবোধ্য পুষ্টি-তথ্য কিংবা প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘Innovate today. Nourish tomorrow’ যা বাংলায় ‘আজই উদ্ভাবন করুন, আগামীর পুষ্টি নিশ্চিত করুন’। এই প্রতিপাদ্যটি আমাদের খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়। উদ্ভাবন মানে শুধু নতুন ফসল উৎপাদন বা কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, বরং মানুষকে খাবার সম্পর্কে সঠিক তথ্য বুঝতে এবং সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে, এমন ব্যবস্থাও উদ্ভাবনের অংশ।
পেট ভরলেই কি পুষ্টি নিশ্চিত হয়?
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে অল্প টাকায় চিপস, বিস্কুট, নুডলস কিংবা মিষ্টি পানীয় পাওয়া যায়। ব্যস্ত জীবন, রান্নার সময়ের অভাব, স্বাদের আকর্ষণ কিংবা পরিবারের সীমিত বাজেট, বিভিন্ন কারণে এসব খাবার অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু কোনো খাবার সস্তা বা সহজলভ্য হলেই যে তা পুষ্টিকর, এমন নয়।
স্কুল থেকে ফেরার পথে একটি শিশু কয়েক টাকার চিপস কিনছে। কর্মব্যস্ত দিনের ফাঁকে কেউ প্যাকেটজাত নুডলস খাচ্ছেন। দৃশ্যগুলো আমাদের পরিচিত। এসব খাবার কেনার পেছনে ব্যক্তিগত পছন্দ যেমন আছে, তেমনি সময়, সামর্থ্য ও বিকল্পের প্রশ্নও রয়েছে। তাই মানুষ কী খাচ্ছে, শুধু তা জানলেই হবে না; কেন সেই খাবার বেছে নিচ্ছে এবং খাবার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পাচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
খাদ্যনিরাপত্তা মানে শুধু খাবারের প্রাপ্যতা নয়। খাবারটি পুষ্টিকর কি না, তার দাম মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে কি না এবং ভোক্তা সেটি সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য পাচ্ছেন কি না, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাবার অনেকের নাগালের বাইরে থাকলে শুধু ব্যক্তিকে ভালো খাবার বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বাজারে সহজলভ্য প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টিগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার নিয়মিত গ্রহণ স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন এমন খাদ্যপরিবেশ, যেখানে মানুষ সহজে তথ্য বুঝতে পারবেন এবং সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
উদ্ভাবন শুধু উৎপাদনে নয়, তথ্য বোঝার সুযোগেও।
২০২৬ সালের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্যটি পড়লে প্রথমেই কৃষি, খাদ্য উৎপাদন কিংবা নতুন প্রযুক্তির কথা মনে হতে পারে। কিন্তু উদ্ভাবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রয়েছে, আমরা কী খাচ্ছি, তা সহজে বোঝার সুযোগ তৈরি করা। আর সেখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং, অর্থাৎ প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কের সামনের অংশে সহজবোধ্য পুষ্টি-তথ্য বা সতর্কবার্তা প্রদানের ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা যথেষ্ট স্পষ্ট। জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথ প্রতিবেদন The State of Food Security and Nutrition in the World 2026 অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য রাখেননি, সংখ্যায় যা প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ২৬ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ মাঝারি বা তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিলেন। অর্থাৎ, আমাদের খাদ্যচ্যালেঞ্জ শুধু খাবারের প্রাপ্যতা নয়; পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার সামর্থ্যও বড় প্রশ্ন।
এই বাস্তবতায় প্যাকেটজাত খাবার সম্পর্কে স্পষ্ট পুষ্টি-তথ্য পাওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি পণ্যের দাম বা স্বাদ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ। কিন্তু তাতে কতটা চিনি, লবণ বা চর্বি রয়েছে, তা দ্রুত বোঝা সব সময় সহজ নয়। প্যাকেটের পেছনে লেখা পুষ্টি-তথ্য ছোট অক্ষরে থাকলে, ভাষা দুর্বোধ্য হলে কিংবা তথ্য খুঁজে পেতে সময় লাগলে কেনার মুহূর্তে তা ভোক্তার সিদ্ধান্তে কতটা কাজে আসে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
এখানেই এফওপিএলের গুরুত্ব। প্যাকেটের সামনের অংশে সহজে চোখে পড়ে এমন পুষ্টি-তথ্য বা নির্ধারিত মান অনুযায়ী সতর্কবার্তা থাকলে ভোক্তা দ্রুত বুঝতে পারেন, কোনো পণ্যে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ বেশি কি না। এতে বিভিন্ন পণ্যের মধ্যে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে। এফওপিএল ভোক্তার হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে না; বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে বুঝতে সাহায্য করবে।
আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি
বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে এফওপিএলের যোগসূত্র এখানেই। উদ্ভাবন মানে সব সময় নতুন কিছু তৈরি করা নয়; বিদ্যমান ব্যবস্থাকে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী আরও কার্যকর করে তোলাও উদ্ভাবন। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি খাবার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে বোঝার সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।
বাংলাদেশে প্যাকেটজাত খাদ্যের লেবেলিং নিয়ে নীতিগত কাজ এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জনমত গ্রহণের জন্য খসড়া নিরাপদ খাদ্য (প্যাকেটজাত খাদ্যের লেবেলিং) প্রবিধানমালা প্রকাশ করেছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পরামর্শ ও আলোচনা শেষে খসড়াটি আরও প্রক্রিয়াকরণের জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি; তবে প্রক্রিয়াধীন খসড়াকে কার্যকর প্রবিধান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
এখন প্রয়োজন জনস্বাস্থ্য, পুষ্টিবিজ্ঞান, ভোক্তা অধিকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং খাদ্যশিল্পের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর গঠনমূলক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা বিজ্ঞানভিত্তিক, বাস্তবায়নযোগ্য এবং ভোক্তার জন্য কার্যকর। নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্যাকেটের সামনের অংশে সহজবোধ্য সতর্কবার্তা নিশ্চিত করা গেলে তা ভোক্তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্য প্রস্তুতকারকদের পণ্যের উপাদান পুনর্বিবেচনা ও পুষ্টিগত মানোন্নয়নের জন্যও উৎসাহিত করতে পারে। এর সুফল পেতে প্রয়োজন যথাযথ নিয়ম, বাস্তবায়ন ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।
ছোটবেলার ঐকিক নিয়মের কথায় ফিরে আসি। একটি সঠিক তথ্য থেকে আরেকটি হিসাব করা যায়। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে শুধু তথ্য জানা যথেষ্ট নয়; সেই তথ্য মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হয়। প্যাকেটের গায়ে প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা সেই কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হতে পারে।
‘আজই উদ্ভাবন করুন, আগামীর পুষ্টি নিশ্চিত করুন’ এই আহ্বান বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক। নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভোক্তার জানার অধিকার এবং সচেতনভাবে খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এফওপিএলকে কার্যকর ও বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার আওতায় আনা সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
আজ খাবারের তথ্য সহজবোধ্য করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা আগামী প্রজন্মের আরও সচেতনভাবে খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, পুষ্টিকর ভবিষ্যৎ শুধু বেশি খাবার উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না; মানুষ কী খাচ্ছি, তা বুঝতে পারার সুযোগের ওপরও নির্ভর করে। আর সেই সুযোগ নিশ্চিত করা ব্যক্তি, সরকার, খাদ্যশিল্প ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন