প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানে সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা করছেন, যখন দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা থমকে গেছে। তার জাতীয় নিরাপত্তা দল মাসের পর মাস ধরে অভ্যন্তরীণ প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে, কেন ইরানের জনগণ তাদের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করছে না।
যুদ্ধের শুরুতেই ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, যেখানে তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর ভরসা রেখে ধারণা করেছিলেন যে, তেহরানে মার্কিন এবং ইসরায়েলি বিমান হামলার পর নাগরিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করবে। তবে গোয়েন্দা মূল্যায়নে এই ফলাফলের সম্ভাবনা কম বলে ইঙ্গিত দেওয়ায় অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারা সংশয়ে ছিলেন। তবুও যুদ্ধ শুরুর প্রথম রাতেই ট্রাম্প ইরানি জনগণের উদ্দেশে এক ভিডিও বার্তা দিয়ে সরকার পতনের ডাক দেন এবং একে প্রজন্মের মধ্যে একমাত্র সুযোগ বলে আখ্যা দেন।
তবে সেই চিন্তা দ্রুতই আড়ালে চলে যায় এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য ইরানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা বেশি অগ্রাধিকার পায়। জুন মাসের দিকে ট্রাম্প দাবি করেন যে, তিনি ইরানের রেজিম চেঞ্জ নিয়ে কখনই মাথা ঘামাননি। তিনি তখন উল্লেখ করেন, ওয়াশিংটন খুব যুক্তিবাদী মানুষের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে এবং অন্য দেশের সরকার উৎখাতের মার্কিন প্রচেষ্টা ইতিহাসে কখনও সফল হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ট্রাম্পের মনে এই প্রশ্ন সবসময়ই কাজ করছিল, কেন তার সরকার উৎখাতের আহ্বান কার্যকর হচ্ছে না।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের যাতায়াত যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফেরেনি এবং তেহরানের সঙ্গে সব ধরনের কূটনীতি স্তব্ধ হয়ে গেছে। ফলে ছয় মাস আগে যে সরকার পরিবর্তনের চিন্তায় ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, আবার সেখানেই ফিরে এসেছেন। গত মঙ্গলবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে প্রশ্ন তুলে তিনি লেখেন, ইরানের জনগণ কখন জেগে উঠবে এবং লড়াই করবে?
এই যুদ্ধ এখন এক ধরনের পরিচিত চক্র বা নির্দিষ্ট ধারায় আবর্তিত হচ্ছে। প্রায় এক মাসের আপেক্ষিক শান্তির পর চলতি সপ্তাহে টানা তিন দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে, যা গ্রীষ্মের শুরুর দিকের সেই পাল্টাপাল্টি আক্রমণের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি পুনরুল্লেখ করে ট্রাম্প গত বুধবারে জানান, প্রয়োজন পড়লে তিনি আরও বড় আকারের ধ্বংসাত্মক হামলার আদেশ দিতে প্রস্তুত আছেন। তিনি আরও জানান, এই চলমান যুদ্ধ বেশি দিন স্থায়ী হবে না বলে তিনি মনে করেন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প তার প্রতিনিধিদের ইরানের সঙ্গে আলোচনা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়ার পর এই মুহূর্তে কোনো কূটনৈতিক প্রচেষ্টাই সচল নেই। বরং ট্রাম্প বর্তমান পরিস্থিতির ওপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন এবং লড়াই দ্রুত শেষ করার কোনো তাড়াহুড়ো তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের অর্থনীতির চরম ধসের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
তবে ট্রাম্পের দলের অনেকেই চান, আসন্ন ক্যাপিটল হিল বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের দুই মাস আগে এই যুদ্ধ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরে যাক। ট্রাম্প দাবি করছেন তার নীতিতে নির্বাচনের কোনো প্রভাব নেই, কিন্তু সিনিয়র উপদেষ্টা এবং ক্যাপিটল হিলের রিপাবলিকান মিত্ররা সতর্ক করেছেন যে এই যুদ্ধ তীব্র হলে নির্বাচনের ফলাফলে তা বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বুধবার পরিষ্কার জানিয়ে দেন, ইরান আর কত চাপ সহ্য করতে পারে তা তার দেখার বিষয় নয় এবং এই নির্বাচনের পরোয়া তিনি করছেন না।
যুদ্ধের দৃশ্যমানতা কমানোর এই প্রক্রিয়ার সাথেই যুক্ত রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন কৌশল; ইরানের অর্থনৈতিক রসদ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ এখনো তাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা না করলেও, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে আরও বিপর্যস্ত করার মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ জনগণের ক্ষোভকে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উস্কে দেওয়া। মার্কিন কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন, এই অর্থনৈতিক চাপ ও নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রথম আঘাত এসে পড়বে ইরানের সাধারণ মানুষের ওপর।
ইরানে ইতিমধ্যে অর্থনীতির বাস্তব ধাক্কা লেগেছে; রেকর্ড মাত্রায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের দাম প্রতি সপ্তাহে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং স্থানীয় মুদ্রা রিয়ালের মান হু হু করে কমছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নতুন নিষেধাজ্ঞা আসার আগেই রাষ্ট্রীয় মাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে স্বীকার করেছেন, তাদের দেশ এখন পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে এবং উদ্ভূত সমস্যার জন্য জনগণ ও দেশের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছেন।
তবে পরিস্থিতি অর্থনৈতিক দিক থেকে চরম আকার ধারণ করলেও সাধারণ মানুষের রাস্তায় নেমে সরকার পতনের আন্দোলনের সম্ভাবনা কম বলেই গোয়েন্দা তথ্যে উঠে আসছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ অভিযান শুরুর আগেও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মূল্যায়ন করেছিল যে, এভাবে সেখানে সরকার পরিবর্তন সম্ভব নয় এবং দীর্ঘ কয়েক মাসের লড়াইয়ের পরও তেহরানের শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতার ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। পাশাপাশি কয়েক দশকের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাও এই প্রশাসনকে দুর্বল করতে পারেনি। এর বিপরীতে যেকোনো জনবিক্ষোভকে কঠোর হাতে দমন করা হয়েছে, যেমনটা এই বছরের শুরুর দিকে ইতিহাসখ্যাত চরম দমনপীড়নের মাধ্যমে পরিচালনা করেছিল ইরানি প্রশাসন।
আন্তর্জাতিক সংকটের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ট্রাম্পের এই কৌশল বেশ ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, ইরানি নেতৃত্ব বিশ্বাস করে যে এই অর্থনৈতিক চাপ কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয় বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিস্তৃত পরিকল্পনার অংশ; যার মূল লক্ষ্য অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ তৈরি করে সরকার পরিবর্তন করা অথবা ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা।
অন্যদিকে, সিআইএ বা অন্যান্য ব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসন সরকারবিরোধী ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের অস্ত্র সরবরাহ করবে কি না; এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি। ওভাল অফিসে তিনি শুধু বলেন, আমি এটা জানাতে পছন্দ করতাম, তবে তা বলাটা এখন উপযুক্ত হবে না। আর কেন ইরানি জনগণ একযোগে বিদ্রোহ করছে না, সেই প্রসঙ্গে তিনি কিছুটা সহানুভূতি প্রকাশ করে স্বীকার করেন, আমি তাদের দুর্দশা বুঝতে পারছি, রাস্তায় নামলেই তাদের গুলি করা হচ্ছে।
সূত্র: সিএনএন
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন